ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের হুমকিতে পাল্টা হুঁশিয়ারি তেহরানের

Printed Edition
Int-1
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ান

মেহের নিউজ ও আনাদোলু

  • বিক্ষোভকে অজুহাত করে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প
  • অর্থনৈতিক সঙ্কটকে ইস্যু করে বিক্ষোভে মোসাদের ইন্ধন দেখছে ইরান

ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির তীব্র সমালোচনা ও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এক বিশেষ বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে এবং এটি সরাসরি খোদ আমেরিকার স্বার্থকেই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি কর্মকর্তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে বর্তমান পরিস্থিতির নেপথ্যে থাকা গোপন অভিসন্ধিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, ইরান সরকার সাধারণ ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী বা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের সাথে সেসব ধ্বংসাত্মক ও অশুভ চক্রের পার্থক্যটা স্পষ্টভাবে জানে। তার দাবি, বিদেশী মদদে ইরানে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই হঠকারী ও অ্যাডভেঞ্চারমূলক আচরণের কারণে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা মার্কিন জনগণের উপলব্ধি করা উচিত।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে উদ্দেশ করে নতুন হুমকি দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে প্রস্তুত। ট্রাম্প তার বার্তায় ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ বা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার সামরিক পরিভাষা ব্যবহার করে সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই মূলত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

এ দিকে গত এক সপ্তাহে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কিছু ব্যক্তিকে আটকের খবর নিশ্চিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আটক ব্যক্তিরা বিদেশী মদদপুষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল এবং প্রতিবাদের আড়ালে দাঙ্গা উসকে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তেহরান শুরু থেকেই বলে আসছে, তারা নাগরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলেও বিদেশের ইশারায় পরিচালিত কোনো নাশকতা বরদাস্ত করবে না। বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে চরম পরিহাস হিসেবে দেখছেন, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের দেশে বিক্ষোভ দমনের রেকর্ডও বেশ বিতর্কিত। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র আড়াল করতে বিদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর এই পুরনো কৌশল বেছে নিয়েছে।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ইরানে যে অস্থিরতা চলছে, তার পঞ্চম দিন বৃহস্পতিবার নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে আরো কয়েকজনের প্রাণহানি হয়েছে। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এবং মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাউ জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের লোরদেগান শহরে সংঘর্ষে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের আজনা শহরে তিনজন এবং কুহদাশত শহরে আরো একজন নিহত হয়েছেন বলে ফার্স নিউজ জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে গাড়িতে আগুন দেয়া হচ্ছে। অনেক বিক্ষোভকারী দেশটির সর্বোচ্চ নেতার শাসনের অবসান চেয়ে স্লোগান দিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ রাজতন্ত্রে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন রাজধানী তেহরানসহ লোরদেগান ও মারভদাশতের মতো শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ দমনের চেষ্টার অংশ হিসেবে বুধবার দেশটির কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। সরকারের তরফে তীব্র শীতে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য ছুটির কথা বলা হলেও অনেক ইরানি একে বিক্ষোভ ঠেকানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তার সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘যৌক্তিক দাবি’ শুনবে। তবে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেয়া হবে।