দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে প্রস্তুত হামাস, তবে অস্ত্র সমর্পণ নয়
গত ১৮ মার্চ, ইসরাইলি সেনাবাহিনী একটি চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তি সত্ত্বেও গাজায় আকস্মিক বিমান অভিযান চালায়।
Printed Edition
- গাজায় ইসরাইলি হামলায় আরো ৫৬ জন নিহত
- ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি সমাবেশ
- ইসরাইলের বিমানঘাঁটিতে হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইসরাইলি বিমান হামলায় গাজায় আরো অন্তত ৫৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ চলাকালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৪৯৫ জনে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরো ১০৮ জন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আনাদোলু এজেন্সি জানায়, এ নিয়ে ইসরাইলি আগ্রাসনে মোট আহতের সংখ্যা পৌঁছেছে এক লাখ ১৭ হাজার ৫২৪ জনে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, অনেক হতাহত এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে ও রাস্তায় আটকা পড়ে আছে, কারণ উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। গত ১৮ মার্চ, ইসরাইলি সেনাবাহিনী একটি চুক্তি অনুযায়ী জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তি সত্ত্বেও গাজায় আকস্মিক বিমান অভিযান চালায়। এতে দুই হাজার ১১১ জন নিহত এবং পাঁচ হাজার ৪৮৩ জন আহত হয়। এর আগে গত নভেম্বর মাসে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। গাজায় চালানো এই যুদ্ধের জন্য ইসরাইল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার অভিযোগের মুখোমুখিও রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে প্রস্তুত হামাস, তবে অস্ত্র সমর্পণ নয়
গাজায় ইসরাইলের সাথে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি জন্য উন্মুক্ত হলেও অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি নয় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। সংগঠনটির নেতারা যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীদের সাথে সাক্ষাতে এ কথা বলেছেন। আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, হামাস তাদের প্রস্তাবের জন্য মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে সমর্থন গড়ে তোলার আশা করছে।
তারা আরো জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান, গাজার পুনর্গঠন, ইসরাইলে বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তি এবং গাজার সব বন্দীর মুক্তির বিনিময়ে পাঁচ থেকে সাত বছরের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে পারে হামাস।
হামাসের মিডিয়াবিষয়ক উপদেষ্টা তাহের আল-নোনো বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির আইডিয়া বা এর সময়কাল আমরা প্রত্যাখ্যান করিনি। আমরা আলোচনার কাঠামোর মধ্যে এটি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। যুদ্ধের অবসানের জন্য আমরা যেকোনো গুরুতর প্রস্তাবের জন্য উন্মুক্ত।’ তবে নোনো হামাসের অস্ত্র সমর্পণের ইসরাইলের যে দাবি রয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হামাসের অস্ত্র আলোচনার যোগ্য নয় এবং যতক্ষণ দখলদারিত্ব থাকবে ততক্ষণ তা আমাদের হাতে থাকবে।’ ইসরাইলের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হাসকেল এই সপ্তাহে নতুন প্রস্তাবের সাফল্যের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হামাস যদি বাকি ৫৯ জন বন্দীকে মুক্তি দেয় এবং অস্ত্র সমর্পণ করে, তাহলে আগামীকালই যুদ্ধ শেষ হতে পারে।’
ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি সমাবেশ
গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী আইডিএফের বর্বরতায় প্রাণ গেছে আরো ৪০ ফিলিস্তিনির। শনিবার উপত্যকাজুড়ে আইডিএফের নির্বিচার হামলায় নিহত হয়েছে তারা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে এ তথ্য। গতকাল রোববারও ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে আইডিএফ। এএফপির বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, মধ্য গাজার দেইর আল বালাহর সাবরা এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছে একই পরিবারের ১০ জন। তবে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। নেতানিয়াহু প্রশাসনের নিরাপদ ঘোষিত এলাকা আল-মাওয়াসিতেও থেমে নেই হামলা। গতকাল রোববারও আইডিএফের ড্রোন হামলায় এলাকাটিতে তিনজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
রাফাহতেও চলছে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। হামলার তীব্রতায় সেখানে হতাহতের ব্যাপারে কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। জানা গেছে, নুসেইরাহ শরণার্থীশিবিরে সবচেয়ে তীব্র হামলা চলছে। এ ছাড়া, উপত্যকায় খাদ্যসঙ্কটও পৌঁছেছে চরমে। দেড় মাস ধরে উপত্যকায় চলমান ইসরাইলি অবরোধে গাজায় স্মরণকালের ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিগগিরই কোনো ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর হবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। গাজা ইস্যুতে নেতানিয়াহু প্রশাসনের এমন অমানবিক অবস্থানে এবার ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে খোদ ইসরাইলিরাও।
ইসরাইলের বিমানঘাঁটিতে হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
দখলদার ইসরাইলকে লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে হাউছিরা। তারা জানিয়েছে, ইসরাইলের নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে এই হামলা চালিয়েছে তারা। ক্ষেপণাস্ত্রটি ইসরাইল আটকাতে পারেনি বলেও জানিয়েছে তারা। এই তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা আনাদোলু।
বার্তাসংস্থাটি বলছে, ইয়েমেনের হাউছিরা বলেছে, তারা ইসরাইলের নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে একটি ‘প্যালেস্টাইন-২’ হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। শনিবার টেলিভিশনে প্রচারিত এক বক্তব্যে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এ কথা জানান। তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এটি প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এর আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, তারা ইয়েমেন থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই প্রতিরোধ করেছে। এ সময় বেশ কয়েকটি এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে।
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে হাউছিরা লোহিত সাগর, আরব সাগর, বাব আল-মানদাব প্রণালী ও এডেন উপসাগর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। তারা জানিয়েছে, গাজায় ইসরাইলের হামলায় ফিলিস্তিনিদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতেই তারা এই আক্রমণ চালাচ্ছে।
ইসরাইলে ‘দেশ অচলের’ ডাক
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করে বন্দীদের মুক্ত এবং ইসরাইলে ইহুদি গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। তেল আবিবের এই বিক্ষোভ থেকে ‘দেশ অচলের’ ডাক দিয়েছেন যুদ্ধবিরোধীরা। খবর আলজাজিরার। ইসরাইলের বৃহত্তম শহর তেল আবিবে শনিবার বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে দু’টি যুদ্ধবিরোধী পক্ষ। তারা পৃথক স্থানে জড়ো হলেও পরে একত্র হয়ে সমাবেশ করেছে। সমাবেশে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেটের সাবেক প্রধান অ্যামি আয়ালন ‘অহিংস বেসামরিক বিদ্রোহের’ ডাক দিয়েছেন। অ্যামি আয়ালন তেল আবিবে জনতার উদ্দেশে বলেন, আপনারা রাস্তায় নেমে আসুন। সবাইকে এক হয়ে দেশ অচল করে দিতে হবে। আয়ালন বলেন, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন প্রতিটি মানুষের নাগরিক কর্তব্য। কেননা, আমরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রণীত ইসরাইলের ইহুদি-গণতান্ত্রিক পরিচয়ের জন্য লড়াই করছি। গাজায় বন্দীদের মুক্ত করে আনতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া স্বজনদের ওপর নেতানিয়াহু সরকারের দমন-পীড়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিক্ষোভ করতে ইচ্ছুক নাগরিকদের ওপর নেতানিয়াহু নজরদারি শুরু করেছেন। শিন বেটের বর্তমান প্রধান রোনেন বারও সম্প্রতি একই দাবি করেছেন। তিনি অবশ্য নেতানিয়াহুর সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত।