তিস্তা প্রকল্পে ভারত চীন উভয়ের সাথে সহযোগিতা সম্ভব

সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition
Touhid
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন | সংগৃহীত

তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত বা চীন উভয়ের সাথে সহযোগিতা সম্ভব উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, আমরা ওপেন আছি। ভারতের সাথেও সহযোগিতা সম্ভব, চীনের সাথেও সম্ভব। কোনোটাতেই বাধা নেই। আমরা দেখব প্রকল্পে কোথা থেকে সহায়তা নিলে আমাদের সুবিধা হবে। সে অনুযায়ী সরকার কাজ করবে।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্প্রতি বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং এবং ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক সম্পর্কে তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের সাথে আলাপ করছিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অনুরোধে চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছিল। এ ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ মেয়াদে ভারত তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সংযোগ স্থাপনকারী ‘চিকেন নেক’ হিসাবে পরিচিত এলাকাটি সামরিক দিক থেকে স্পর্শকাতর বিবেচনা করা হয়। এ অঞ্চলের কাছাকাছি তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের কাজ করার ব্যাপারে দিল্লির আপত্তি রয়েছে। তবে ভারত একই সাথে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করতেও সক্ষম হচ্ছে না।

বেইজিং সফরে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনা কোম্পানিকে স্বাগত জানানোর অগ্রগতি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অগ্রগতি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমরা হঠাৎ করে প্রত্যাশা করছি না যে কালকেই কেউ তিস্তা সমস্যার সমাধান করে দেবে। নদীর পানি নিয়ে চীনের সাথে আমাদের একটি আমব্রেলা এগ্রিমেন্ট রয়েছে। সব দেশের জন্যই নদীর পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে আমাদের জন্য। তিনি বলেন, চীনে কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ থাকলে অন্যান্যপর্যায়ে সম্পর্ক আগানো সহজ হয়। দুই নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু কাগজপত্র সই হয়েছে। আমার মনে হয় এই সফরটি মোটামুটিভাবে একটি ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পেরেছে।

নরেন্দ্র মোদির সাথে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কী আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, তবে চূড়ান্ত কিছু হয়নি। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব পালন শেষ করে খুব শিগগির নির্বাচন দেয়াই আমাদের অঙ্গীকার। তবে আলোচনার সময় মোদি জানতে চাইতেই পারেন। এটা স্বাভাবিক।

বাংলাদেশীদের জন্য ভারতের ভিসা বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ভিসা হচ্ছে একটা দেশের সম্পূর্ণ স্বাধীন অধিকার। এ নিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আপনি তাদের বলতে পারবেন না, কেন ভিসা দিচ্ছেন না। আমরাও সাময়িকভাবে ভারতীয়দের ভিসা দেয়া বন্ধ করেছিলাম। তবে কোনো দেশের ভিসা বন্ধ হলে শূন্যতা থাকে না। মানুষ অন্য দেশে সমাধান খুঁজে নেয়। আমাদের লোকজন যেসব কারণে ভারতে যেত সেটা যদি অন্য কোনো দেশে সমাধান করা যায় আমরা তাতে সহায়তা করব। আর ভারত যদি ভিসা দেয় সেটা তাদেরও স্বার্থ উদ্ধার হবে, আমাদেরও হবে। আমরা জানি, ভিসা না দেয়ার কারণে কলকাতার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ইতালি যেতে আগ্রহী বাংলাদেশী কর্মীদের ভিসা জটিলতা নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত দেশটির সাথে যোগাযোগে আছি। কিছু সমস্যা আছে যেটাতে আমাদেরও দোষ আছে। নিজেদের দোষ স্বীকার করা উচিত। ভিসার জন্য যেসব কাগজপত্র বাংলাদেশীরা দূতাবাসে জমা দিয়েছে, তার অনেকগুলোই সঠিক নয়। ইতালিয়ানরা সেটা চিহ্নিত করেছে। তারা আমাদের বলেছে, এগুলো চেকআপ না করে ভিসা দিতে পারবে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। আর তাদের সন্দেহ অমূলক নয়।

ইতালি যেতে আগ্রহী বাংলাদেশী কর্মীদের উদ্দেশে তৌহিদ হোসেন বলেন, যারা সাফার করছেন তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি আছে। আমি নিশ্চিত তাদের মধ্যে অনেকে সঠিক কাগজপত্র জমা দিয়েই ভিসার আবেদন করেছেন। কিন্তু সঠিকের সাথে বেঠিক কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করা হলে সবগুলো চেক করতে হয়। আর

এতে করে সবাইকেই সাফার করতে হয়। এখানে সেটাই ঘটছে। এখন ভিসা আবেদনকারীরা যদি আন্দোলন করে তাহলে এর সমাধান হবে না। এই সমস্যার সমাধান ইতালিয়ানদের হাতে। আমরা তাদের অবিরাম চাপ দিয়ে যাচ্ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসছেন : আাগমী ১৫ এপ্রিল চার দিনের সফরে ঢাকা আসছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোল চুলিক। পরদিন অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল আসার কথা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ড্রু হেরাপের। বাংলাদেশে অ্যান্ড্রু হেরাপের সফরসঙ্গী হিসেবে মিয়ানমারে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত সুসান স্টিভেনসনের যোগ দেয়ার কথা রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়ার পর এটি হতে যাচ্ছে দেশটির উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধিদলের প্রথম বাংলাদেশ সফর। প্রতিনিধিদলটি এমন একটি সময় বাংলাদেশ সফর করছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলাপাড় চলছে। বাংলাদেশী পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর জন্য নানাবিধ প্রচেষ্টা চলছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এই সফরে বাংলাদেশের সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে সহায়তা, মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে।