পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হুমকি
Printed Edition
- ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অষ্টম দিনের মতো গোলাগুলি
- আজাদ কাশ্মিরকে ২ মাসের খাদ্য মজুদের নির্দেশ
ভারতশাসিত কাশ্মিরের পহেলগামে হামলার পেছনে কারা জড়িত তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সীমিত পরিসরে সামরিক হামলার আভাসও মিলছে। দু’দেশই রণপ্রস্তুতি নিয়ে পরস্পরকে হুমকি-হুঁশিয়ারি অব্যাহত রেখেছে। এতে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও একই পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হামলার ঘটনায় পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা-আইএসআই ও কট্টরবাদী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার যোগশাজস রয়েছে বলে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা-ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনআইএ) প্রাথমিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এমন খবর দিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। যা মূলত অনুমাননির্ভর। অন্য দিকে হামলার পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত বলে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ টেলিগ্রামে ফাঁস হওয়া গোপন নথির উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেছে পাকিস্তানের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম। ওই নথির সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
টেলিগ্রামে ফাঁস হওয়া গোপন নথির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, পহেলগামের ওই ঘটনাটিকে ‘অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা’ বলে প্রচার চালানোর সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
ভারতীয় এজেন্সি এনআইএর সূত্রগুলো দাবি করেছে, পহেলগামে ২৬ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়া সন্ত্রাসী হামলার ছক লস্কর-ই-তৈয়বাই করেছে, এটি আইএসআইয়ের ঊর্ধ্বতন চরদের নির্দেশনায় হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ছকটি পাকিস্তানে লস্করের সদরদফতরে চূড়ান্ত হয়েছে বলেও অনুমান করা হয় এনআইএর প্রাথমিক প্রতিবেদনে।
পর্যটকদের ওপর হওয়া ওই নৃশংস হামলার দুই সন্দেহভাজন হাশিম মুসা ওরফে সুলেমান ও আলি ভাই ওরফে তালহা ভাই উভয়েই পাকিস্তানি নাগরিক। তারা তাদের পাকিস্তানভিত্তিক ‘হ্যান্ডলারদের’ সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং সময়, লজিস্টিকস ও হামলা কার্যকরের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নিতেন, আটক একাধিক চর জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি এনআইএর।
তবে এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়েছে, টেলিগ্রামে প্রকাশিত নথিতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে জড়িয়ে ে প্রাপাগান্ডা ছড়াতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে। বেশ কয়েকটি সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ফাঁস হওয়া নথিটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় সরকারও পহেলগাম হামলায় জড়িত। নথিতে দেয়া নির্দেশনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্যে যে গরমিল হয়েছে, তা থেকেই এই “ফলস ফ্ল্যাগ” হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ ভারত নিজেই এই হামলা সাজিয়েছে যেন পাকিস্তানের ওপর দোষ চাপানো যায়।
অন্য দিকে এনআইএ’র দাবি, হাশমি ও আলি ভাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে ভারতে ঢোকেন; গোপন সহায়তাকর্মীদের (ওজিডব্লিউ) একটি নেটওয়ার্ক তাদের আশ্রয়, ঘোরাফেরা ও হামলার স্থান নির্ধারণসহ স্থানীয় লজিস্টিকাল সরবরাহ করেছে। তদন্তের জন্য এনআইএ বিপুল পরিমাণ ফরেনসিক ও ইলেকট্রনিক তথ্য জড়ো করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ৪০টির বেশি কার্তুজ ব্যালিস্টিক ও রাসায়নিক পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়। তদন্তকারীরা হামলার স্থানটির থ্রিডি ম্যাপিং করেছেন এবং উপত্যকার আশপাশের মোবাইল টাওয়ার থেকে ডাম্প ডেটাও সংগ্রহ করেছেন। হামলার কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় হুট করে স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবহার বেড়ে গিয়েছিল। তদন্তকারীরা বৈসরন ও এর আশপাশে অন্তত তিনটি স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহারের বিষয় নিশ্চিত হয়েছেন, যার মধ্যে দুটির সঙ্কেত শনাক্ত ও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এদিকে এনআইএ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এ পর্যন্ত দুই হাজার ৮০০র বেশি লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে; এখনো নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা দেড়শ’র ওপরে, তাদেরকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও হুরিয়াত কনফারেন্সের বিভিন্ন উপদলসহ অনেক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রয়েছেন। পাশাপাশি কাশ্মিরের বারামুল্লা, অনন্তনাগ, সোপোরে, পুলওয়ামা ও কুপওয়ারাসহ একাধিক জেলায় অভিযান চলছে। সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী সন্দেহে অনেকের বাড়িঘরেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। হামলাকারীদের গতিবিধি শনাক্ত করতে এনআইএ পহেলগাম ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট ও জনবহুল স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা চেকপোস্টগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের চলাচলের ধরন চিহ্নিত করার কাজও চলছে।
অন্য দিকে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাম নথির বরাতে বলছে, হামলার ৩৬ ঘণ্টা পরে পাকিস্তানবিরোধী প্রচার চালানোর জন্য মিডিয়াকে নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে, মিডিয়া হামলার সাথে সাথেই পাকিস্তানকে দায়ী করে বসে, যার ফলে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। সূত্রগুলো বলছে, এই নথি এবং তাতে থাকা বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-কেও অন্য কোনো মহল থেকে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া নথিটি এভাবে প্রকাশ হওয়াটাই ‘র’-এর ভেতরে বিদ্যমান হিন্দুত্ববাদবিরোধী মনোভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া কীভাবে এই নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হলো তা খুঁজে বের করতে ভারত সরকার তদন্ত করছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফাঁস হওয়া নথি বলছে, সাজানো এই অপারেশনটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল এমন সময়ে যখন মার্কিন ভাইস ে প্রসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত সফরে ছিলেন, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্যের আহ্বান জানানো যায়।
কড়া বার্তা অমিত শাহের : কাশ্মিরে হামলায় জড়িতদের উদ্দেশে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মিরের পহেলগামে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যায় জড়িতদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করবে ভারত। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের জন্য এখনো খারাপ সময় আসেনি। পহেলগামে যারা ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে তাদের রেহাই দেয়া হবে না। আমরা হামলার প্রতিটি অপরাধীকে খুঁজে বের করব। ভেবো না যে ২৬ জনকে হত্যা করে তোমরা জিতেছ। তোমাদের প্রত্যেককে জবাবদিহি করতে হবে।’
আসিম মুনিরের হুঁশিয়ারি : ভারতের যেকোনো দুঃসাহসের দ্রুত জবাব দেয়া হবে বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির। গত বৃহস্পতিবার দেশটির সেনাদের সামরিক মহড়া পরিদর্শনে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। পাকিস্তানের সেনা প্রধান বলেন, ‘একটি বিষয় নিয়ে কোনো রকমের বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। তা হলো, ভারতের যেকোনো সামরিক দুঃসাহসের দ্রুত জবাব দেয়া হবে, যা হবে দৃঢ় এবং আরো জোরালো।’
সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি : এদিকে কাশ্মির সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বরাবর ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে আবারো গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে টানা আট রাত ধরে কাশ্মির সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটল।
পাকিস্তানের মহড়া : পহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে ভারতের সাথে উত্তেজনার মধ্যে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) সংলগ্ন এলাকায় পূর্ণমাত্রার সামরিক মহড়া চালিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার এই সামরিক মহড়ায় গোলাবর্ষণের অনুশীলনসহ যুদ্ধ প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। “শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য আগ্রাসনের জবাবে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া জানাতে সেনাবাহিনী প্রস্তুত, এমন একটি বার্তা দিতে চেয়েছে ইসলামাবাদ,” লিখেছে পত্রিকাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা এবং সৈন্যরা এ মহড়ায় অংশ নেন। বাহিনীর হাতে থাকা উন্নত যুদ্ধ সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৌশলগত দক্ষতা প্রদর্শন করা হয় সেখানে।
এর আগের দিন বুধবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনীর ‘উসকানিমূলক’ গুলির জবাবে কিয়ানি ও ম্যান্ডাল সেক্টরে একটি ভারতীয় চৌকি ধ্বংস করে দিয়েছে তারা। নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, জম্মু-কাশ্মিরের চাকপুত্রা চৌকিও ধ্বংস করা হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাল্টা হামলায়।
কোয়েটায় হিন্দুদের বিক্ষোভ : জম্মু-কাশ্মিরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত সরকারের পাকিস্তানবিরোধী অভিযোগের নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়। গত বুধবার বেলুচিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যালঘু সদস্য ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা সঞ্জয় কুমারের নেতৃত্বে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের খবর অনুসারে, বিক্ষোভকারীরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার হাতে নিয়ে কোয়েটার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হন। তারা পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দেন।
আজাদ কাশ্মিরে খাদ্য মজুদের নির্দেশ : বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার নিয়ন্ত্রণরেখার নিকটবর্তী আজাদ কাশ্মির এলাকার বাসিন্দাদের খাদ্য মজুদ করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পহেলগামে বন্দুকধারীর হামলার পর দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা চলার মধ্যে গতকাল শুক্রবার এ নির্দেশ দেয়া হয়।
স্থানীয় প্রাদেশিক পরিষদে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ার উল হক বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণরেখাসংলগ্ন ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য দুই মাসের খাদ্য সরবরাহ মজুদ করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, আঞ্চলিক সরকার ওই ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য ‘খাদ্য, ওষুধ এবং অন্য মৌলিক চাহিদাগুলোর’ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০০ কোটি রুপির (৩৫ লাখ মার্কিন ডলার) একটি জরুরি তহবিল গঠন করেছে। নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এলাকাগুলোর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন যন্ত্রপাতিও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান আনোয়ার উল হক। তা ছাড়া সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কায় গত বৃহস্পতিবার আজাদ কাশ্মিরের কর্তৃপক্ষ ১০ দিনের জন্য এক হাজারেরও বেশি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।