সময় পেরিয়েও অম্লান: ফ্লিটউড ম্যাকের চিরসবুজ রুমার্স

সাকিবুল হাসান
Printed Edition
Bino-1
সময় পেরিয়েও অম্লান: ফ্লিটউড ম্যাকের চিরসবুজ রুমার্স

একজন টাইম ট্রাভেলার যদি হঠাৎ আজ থেকে ৫০ বছর আগে-১৯৭৫ সাল থেকে-বর্তমানের যুক্তরাজ্যে এসে পড়েন, তবে সবচেয়ে বড় চমকটি তিনি পেতেন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখে নয়, বরং একটি ব্যান্ডের অবিরাম উপস্থিতি দেখে : ফ্লিটউড ম্যাক।

১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ব্যান্ডটির ঐতিহাসিক গানসমষ্টি রুমার্স আজও যেন সময়ের বাধা মানে না। এই সঙ্গীত ও ব্যান্ডের সুর এখনো যেমন শ্রোতাকে টানে, তেমনি অনুপ্রাণিত করে নতুন প্রজন্মকে। সম্প্রতি ‘স্টেরিওফোনিক’ নামের একটি নাটক পশ্চিম লন্ডনের মঞ্চে আসার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। নাটকটির প্রেক্ষাপট ১৯৭৬ সাল, যেখানে একটি সঙ্গীতদলের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, সৃষ্টিশীল সঙ্কট ও রেকর্ডিং স্টুডিওর নাটকীয়তা তুলে ধরা হয়েছে; যা অনেকেই রুমার্স তৈরি হওয়ার কাহিনীর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। যদিও নাটকটির লেখক ডেভিড অ্যাজমি সরাসরি কোনো সংযোগ অস্বীকার করেছেন, অ্যালবামের প্রযোজক কেন ক্যালিয়াট এ নিয়ে মামলা করেছিলেন, যা পরে নিষ্পত্তি হয়।

তবে এই নাটক ফ্লিটউড ম্যাকের চলমান প্রাসঙ্গিকতার একটি দৃষ্টান্তমাত্র। গত এক দশকে ডেইজি জোন্স অ্যান্ড দ্য সিক্স নামের উপন্যাস ও নাট্যরূপেও উঠে এসেছে ‘একটি সঙ্গীতদল, সম্পর্ক আর সৃষ্টিশীল টানাপড়েনের’ অনুরণন; যার ছায়ায় অবচেতনভাবেই রয়েছে ফ্লিটউড ম্যাক। আজও রুমার্স অ্যালবামটি যুক্তরাজ্যের গান তালিকায় রয়েছে ১০৯৮ সপ্তাহ অতিক্রম করে এটি বর্তমানে রয়েছে ২২ নম্বরে। আর ব্যান্ডটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত নির্বাচিত গানসমষ্টি ৫০ বছর থামো না রয়েছে ৬ নম্বরে। অর্ধশতক পেরিয়েও এই গানের দলটির সুর যেন পুরনো হয়ে যায়নি।

কানাডার গায়িকা তামারা লিন্ডেম্যান (দ্য ওয়েদার স্টেশন) বলেন, “ড্রিমস গানটির বেজ, ঢোল আর কণ্ঠস্বরের বিন্যাস এখনকার অনেক সমসাময়িক আরএনবি কিংবা হিপ-হপ গানের মতোই- খুবই সংক্ষিপ্ত, পরিশীলিত, আর আধুনিক।”

তিনি আরো বলেন, ‘স্টিভি নিকসের গায়কীতে যে তাল রয়েছে, তা একেবারেই আধুনিক; তিনি সময়ের সঙ্গে খানিকটা পিছিয়ে গাইতে ভালোবাসেন, যেন একটা দোল খাওয়ার ভাব থাকে; যা অনেকটাই আজকের দিনের গায়কদের মতো।’

নতুন প্রজন্মের, বিশেষ করে তরুণী শ্রোতাদের এই ব্যান্ডের প্রতি আকর্ষণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন স্টিভি নিকস ও ক্রিস্টিন ম্যাকভি। তাদের লেখা গানগুলোর আবেগ, শক্তি ও নারীর ভেতরের ভাঙনকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ, এই ব্যান্ডকে আলাদা করে তোলে।

তামারা বলেন, তারা যে দুর্বলতা প্রকাশ করেন, সেটার মধ্যেও একধরনের দৃঢ়তা আছে; যেন হৃদয়ের এক নায়িকা। ২০১৯ সালে ফ্লিটউড ম্যাকের শেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানে দেখা গেছে এক বড় পরিবর্তন : বয়সভিত্তিক শ্রোতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিল বড় সংখ্যায় তরুণ-তরুণী, যাদের কাছে রুমার্স এক নতুন সুরের মতোই অনুরণিত হয়েছে। ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডগফেস নামের এক স্কেটবোর্ডচালক ‘ড্রিমস’ গানটির সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে ভাইরাল হলে সেই জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বেশিরভাগ পুরনো সঙ্গীতদল যেখানে নিজেদের অতীতকে আড়াল করতে চায়, ফ্লিটউড ম্যাক বরং সেটাকেই সামনে এনেছে- নতুন কিছু না বানিয়ে, পুরনো গানকে নিয়েই দেশজুড়ে সঙ্গীতানুষ্ঠান করেছে। আর তাতেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত সময়াতীততা।

২০২২ সালে ক্রিস্টিন ম্যাকভি মৃত্যুবরণ করেন। ব্যান্ডটি এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়, তবে প্রতিষ্ঠাতা মিক ফ্লিটউড ইঙ্গিত দিয়েছেন- ব্যান্ডটি ভবিষ্যতে নতুন কোনো রূপে ফিরে আসতে পারে।

আর তত দিন শ্রোতারা হয়তো বারবারই ফিরে যাবেন সেই গানসমষ্টির কাছে, যেখানে সম্পর্ক ভেঙেছে, কিন্তু সুর গেঁথেছে অমর আবেগে। রুমার্স আজও যেন বলে : সুর যদি সত্য হয়, সময় তাকে স্পর্শ করতে পারে না।