বাজেটে তামাক কর সংস্কারের আহ্বান পিপিআরসির
রাজস্ব বাড়বে ধূমপান কমবে
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন ও করনীতি বিশ্লেষণ বিভ্রান্তির মধ্যে আটকে আছে। এ থেকে বের হতে না পারলে নতুন প্রজন্মকে তামাকের ছোবল থেকে রক্ষা করা যাবে না। তামাক খাতে কর বৃদ্ধি করলে কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়তে পারে এমন ধারণা অমূলক। তিনি বলেন, তামাকের ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ একমাত্রিক বিষয় নয় বরং নতুন প্রজন্মকে তামাকের শিকার হতে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি তামাক নিবারণে স্কুল হেল্থ কর্মসূচি চালুর তাগিদ দিয়ে বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প থাকলেও তা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখছে না। একই সাথে তিনি কৃষককে তামাক চাষ থেকে ধাপে ধাপে লাভজনক ফসল চাষের দিকে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন।
গতকাল রোববার ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট সংবাদ সম্মেলন : জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাক করনীতি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আসন্ন বাজেটে তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর এবং রাজস্ব বৃদ্ধির সহায়ক একগুচ্ছ নীতিগত প্রস্তাব দেয়া হয়।
প্রস্তাবে, বিদ্যমান সিগারেটের নি¤œ ও মধ্যম মূল্যস্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি সব মূল্যস্তরে সমভাবে প্রযোজ্য প্রতি ১০ শলাকায় চার টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে। ‘ইকোনমিকস ফর হেলথ’, বিশ্ব¦ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের (আইএইচই) যৌথ উদ্যোগে এই প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে, যা তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন এন শিমুল তার প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, প্রস্তাবিত করব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবেন এবং তিন লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ তামাক ব্যবহার শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে এতে প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ও এক লাখ ৮৫ হাজার তরুণের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। একই সাথে তামাক ব্যবহারের হার প্রায় ০.৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মোট রাজস্ব আদায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা আয় নিশ্চিত করবে।
শাফিউন আরো বলেন, দীর্ঘদিন থেকে তামাক নিয়ন্ত্রণে যেসব প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে তা বাস্তবায়ন হলে গত ১০ বছরে এক ট্রিলিয়ন টাকা সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে পারত। একই সাথে ৮১ লাখ মানুষকে তামাক সেবন থেকে বিরত রাখা সম্ভব হতো।
বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইন থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ওসব দেশ তামাক থেকে রাজস্ব আদায়ের পর তা নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসার কাজে ব্যয় করছে। অথচ বাংলাদেশে নাগরিকদের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসার জন্য ৭০ শতাংশ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়।
অনুষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো: আকরাম হোসেন বলেন, তামাকজনিত অসংক্রামক রোগের অর্থনৈতিক বোঝা তামাক থেকে অর্জিত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, তামাক শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তামাকের ওপর কর সেই অনুপাতে সমন্বয় করা হয়নি। আকরাম হোসেন বলেন, দেশে ৩০ শতাংশ ক্যান্সারের সাথে তামাক সেবন জড়িত।
এসব রোগী বিদেশে গিয়ে চিকিৎসার জন্য আরো পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ করছেন। তামাক থেকে যে রাজস্ব আয় হয় তার চেয়ে ১১৫ শতাংশ বেশি চিকিৎসার জন্য খরচ হয়ে যায়। তিনি বলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি অনুসারে তামাকের ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়নি।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে করনীতি ও আইনপ্রণয়নই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
তামাকের দাম বাড়ালে রাজস্ব কমে যাবে এর কোনো শক্ত প্রমাণ নেই; বরং উচ্চমূল্যে কিশোর-কিশোরীদের ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখতে সহায়ক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সম্প্রতি পাস হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই।
এর ফলে জনসাধারণ, বিশেষ করে তরুণদের কাছে একটি ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বার্তা পৌঁছাতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারকে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে তরুণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।