আইএমএফের শর্তে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি : অর্থমন্ত্রী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম ‘স্বল্পই’ বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আর আমরা এখানে খুব বেশি দাম বাড়াইনি। শ্রীঙ্ককা তো সে দেশে ২০ শতাংশ তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে।

গতকাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশগ্রহণ শেষে অর্থমন্ত্রী দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ মাহমুদ তিতুমীর ও অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

আইএমএফের শর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং অনেক দেশ আগেই দাম সমন্বয় করেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় দাম না বাড়িয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তবে সরকারের তহবিলের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। সরকারের এই পদক্ষেপকে তিনি প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মুদ্রাস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, এমন সরল সমীকরণ সবসময় প্রযোজ্য নয়। এটি সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সরকার যদি জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারে, তা হলে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে আবার নাও পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি নিয়ে করা এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশের চলমান আলোচনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক ছাড়াও বাংলাদেশের সাথে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংস্থার আলোচনা চলছে। এসব সংস্থার সাথে আলাপ-আলোচনা এখনো শেষ হয়নি, বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা আরো কয়েক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি দাবি করেন, খুব শিগগিরই এ দেশে সফরে আসবেন বিশ্বব্যাংক ও এডিবি প্রেসিডেন্ট।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এই আলোচনায় শুধু ঋণের পরিমাণই মূল বিষয় নয়, বরং উভয় পক্ষের চাওয়া-পাওয়া ও শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়। এটি কোনো দাতব্য কার্যক্রম নয় বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক লেনদেন।

তিনি আরো বলেন, সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাই এমন কোনো শর্ত গ্রহণ করা হবে না, যা দেশের জনগণ, অর্থনীতি বা ব্যবসায়ীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে। আমাদের একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার রয়েছে। জনগণের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়।

আইএমএফের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। সেই সরকার ছিল অনির্বাচিত। তাই এতে বিভিন্ন শর্ত যুক্ত রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য নয়। যেসব শর্ত দেশের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো গ্রহণ করা হবে না।

তিনি জানান, কর্মসূচিটির মেয়াদ আরো ছয়-সাত মাস রয়েছে। এর পর ভবিষ্যতে নতুন কোনো কর্মসূচিতে যাওয়া হবে কি না, সে সিদ্ধান্তও সরকার নিজেই নেবে।

শর্ত সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনা শেষ হওয়ার আগে এসব বিষয় জনসমক্ষে আনা সম্ভব নয়।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ, যা জনগণের কাছে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেয় এবং এ ধরনের কর্মসূচিকে সমর্থন করে। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে এবং আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এসব সংস্থা বাংলাদেশের সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী।

অতিরিক্ত বৈদেশিক সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশকে সহায়তা করতে আগ্রহী বলেই আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে কী পরিমাণ সহায়তা পাওয়া যাবে, তা আলোচনা শেষ হওয়ার পরই নির্ধারিত হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়। আলোচনা যেখানে গিয়ে দাঁড়াবে, সেখান থেকেই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো, এটা সম্পূর্ণ আমাদের সিদ্ধান্ত।