শিশুদের ‘আমার বই’ নিয়ে এনসিটিবিতে সিন্ডিকেট

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • রেকর্ড ভেঙে অতিরিক্ত কাগজ ব্যবহারের পাঁয়তারা
  • নির্দিষ্ট তিনটি প্রেসকে কাজ দেয়ার কূটকৌশল চলছে

শিশুদের প্রথম পাঠ প্রি-প্রাইমারির ‘আমার বই’ ও অনুশীলন খাতা নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবিতে) আবারো সক্রিয় হয়েছে একটি সিন্ডিকেট। হাতেগোনা কয়েকটি পছন্দের প্রেসকে প্রি-প্রাইমারির বই মুদ্রণের কাজ পাইয়ে দিতে নানা ধরনের কূটকৌশল করছে এই চক্র। নানাভাবে ফন্দি ফিকির করে বইয়ের সাইজ বৃদ্ধি করে কাগজের ব্যবহার বেশি দেখিয়ে বই এবং অনুশীলন খাতার দাম তথা উৎপাদন খরচ বাড়ানোরও পাঁয়তারা করা হচ্ছে। যদিও এনসিটিবি থেকে জানানো হয়েছে বই মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়ার কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা থাকবে না। সব ধরনের নিয়মনীতি মেনে এবং অধিকসংখ্যক প্রেসকে টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়েই টেন্ডার প্রক্রিয়ার সব কাজ সম্পাদন করা হবে।

এদিকে শিশুদের জন্য বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণের সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত প্রায় ১০ বছর ধরেই প্রাথমিকের প্রি-প্রাইমারির অর্থাৎ শিশু শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য যাদের বয়স (৪ থেকে পাঁচ বছর) অফসেট কাগজে চাররঙা কালারের বিনামূল্যের বই (নাম : আমার বই) সরবরাহ করা হচ্ছে। দেখতে আকর্ষণীয় এবং কাগজের পুরুত্ব ও মানের দিকে দিয়েও এই বইগুলো অন্যান্য শ্রেণীর বইয়ের চেয়ে অনেক উন্নত। বইয়ের টেন্ডারেও এগুলোর সাইজ ও কোয়ালিটি সব কিছুই নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকে। এই বইগুলো নির্ধারিত ওয়েব মেশিন এবং সিট মেশিনেও প্রিন্ট করতে হয়। কাগজের সাইজ দেয়া থাকে ২২ ইঞ্চি বাই ৩২ ইঞ্চি।

কিন্তু চলতি বছরে অর্থাৎ ২০২৬ সালের বিনামূল্যের এই বই মুদ্রণের জন্য আকস্মিকভাবেই কাগজের সাইজ বাড়িয়ে ২৩ ইঞ্চি বাই ৩৬ ইঞ্চি করার একটি প্রক্রিয়া গোপনে শুরু হয়েছে। এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অশুভ উদ্যোগটি সফল হলে আগে থেকে মুদ্রণ কাজের সাথে জড়িত কয়েকডজন প্রেস টেন্ডারে অংশ নেয়া বা কাজ থেকেই বাদ পড়বে। কেননা সরকারের চাহিদা এবং নির্দেশনা মেনেই দুই ডজনের বেশি প্রেস মালিক ২২/৩২ সাইজের মেশিন কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করেছেন। কোনো প্রেস মালিক কিংবা এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তাদের স্বার্থের কারণে এখন কাগজের আগের আকার পরিবর্তন করা হলে হাতেগোনা দুই তিনটি প্রেস ছাড়া বাকি কেউই আর কাজ পাবেন না। টেন্ডারেই অংশ নিতে পারবে না দুই ডজনেরও বেশি প্রেস মালিক।

তাদের অনেকেই এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন, প্রাক-প্রাথমিকের বই মুদ্রণের জন্য গত বছর ৩০টি লটে টেন্ডার আহ্বান করা হলে সেখানে মোট ১১৬টি প্রেসের মধ্যে ৩০টির বেশি প্রেস মালিক অংশ নেন। কিন্তু এবার যদি কাগজের আকার পরিবর্তন করে আগের ২র্র্২র্ /৩র্২র্ এর পরিবর্তে ২র্৩র্ /৩র্৬র্ কাগজে বই মুদ্রনের দরপত্র চাওয়া হয় তাহলে ২৭টি প্রেস সেখানে অংশ নিতেই পারবে না। কেননা তাদের মেশিনগুলো নির্দিষ্ট আকারের কাগজ মুদ্রণের জন্যই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এই মেশিনগুলো এনসিটিবির পরামর্শ বা অনুরোধেই বেশি দামে বিদেশ থেকে কেনা হয়েছিল। এখন সব প্রেসকে টেন্ডারে অংশ নেয়ার সুযোগ সঙ্কুচিত করা হলে কিছু প্রেস একচেটিয়া সুযোগটি নেবে। এই সুযোগে মাত্র দু’তিনটি প্রেস একচ্ছত্রভাবে টেন্ডারে অংশ নিয়ে একচেটিয়া দর দিয়ে সরকারের অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে। বিষয়টি নিয়ে এখনই ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল সন্ধ্যায় এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী নয়া দিগন্তকে জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে আমরা সব ধরনের উদ্যোগ নেবো। আমরা চাই সবার জন্য কাজ করার অবারিত সুযোগ তৈরি করতে। গুটি কয়েক প্রেসকে আমরা কখনোই বাড়তি কোনো সুযোগ দেয়ার পথ উন্মুক্ত রাখব না। সবাই যাতে টেন্ডারে অংশ নিতে পারে এবং কাজের মান ও কাজের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয় সেভাবেই টেন্ডারের শর্ত এবং কাগজের স্পেসিফিকেশনও চাওয়া হবে। কোনো পর্যায়েই কোনো গোপনীয়তা থাকবে। অন্যায় বা অবৈধ কোনো সুযোগও যেন কেউ নিতে না পারে সেই বিষয়েও আমরা সর্বদা সচেষ্ট থাকব।