জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদে ভলকার তুর্ক

মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে বিক্ষোভ দমনে

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition
Page-1
জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদে ভলকার তুর্ক

মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি বিগত সরকারের কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট সহিংস গ্রুপগুলো পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে ছিল শত শত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বাচন আটক ও গ্রেফতার, নির্যাতন এবং নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এবং নির্দেশনায় বিক্ষোভ দমন করে বিগত সরকারকে ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যেই এসব কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় বিক্ষোভকারী ও তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

গতকাল জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের ৫৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশে গত জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন উত্থাপনের সময় হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক এসব কথা বলেন। এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এতে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জেনেভা থেকে ‘তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন-বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা নেয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর জুলাই ও আগস্টের নৃশংসতার ঘটনাগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে সহায়তা দেয়ার জন্য ভালকার তুর্ককে অনুরোধ করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে জাতিসঙ্ঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে আসে। তথ্যানুসন্ধান মিশন ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ তদন্ত করেছে। মিশন প্রায় এক মাস বাংলাদেশে অবস্থান করে নিহতদের পরিবার, আহত, প্রত্যক্ষদর্শী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করেছে। মিশনটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ, সহিংসতার মূল কারণের ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কারসহ বাংলাদেশ সরকারের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে।

তথ্যানুসন্ধান মিশন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছে উল্লেখ করে ভলকার তুর্ক বলেন, মিশনের তদন্তে কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমরা সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা চেষ্টা করেছি। প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে হাইকমিশনার বলেন, নারীরা বিক্ষোভের সম্মুখভাগে ছিল। তারা নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের দ্বারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। হতাহতদের চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বাধা দেয়ার তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। সরকার পতনের পর তাদের নেতাকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী এবং কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় গ্রুপের ওপর গুরুতর প্রতিশোধ নেয়ার ঘটনাও আমরা প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ করেছি।

হাইকমিশনার বলেন, সহিংস বিক্ষোভের মাধ্যমে বিগত সরকারের পতনের পর এখন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সময় এসেছে। এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন আদালতে প্রচুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর বিচারে যাতে যথাযথ সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের একটি অবস্থান রয়েছে। আমরা বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত চাই। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত) যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সত্য বলা, পুনর্মিলন এবং সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে তুর্ক বলেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ কার্যালয়ের শক্তিশালী অবস্থানের প্রয়োজন রয়েছে।

একটি পুঙ্খনাপুঙ্খ ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন দেয়ার জন্য মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশনারকে ধন্যবাদ জানিয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, এই প্রতিবেদনে গত জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তুলে এনেছে। এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে ছিল পতিত সরকারের বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচারে আটকের ঘটনা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে এই প্রতিবেদনের তথ্য-প্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বতর্মান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই-আগস্ট হত্যাযজ্ঞের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং দায়িদের বিচারে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১৯৭৩ অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। এসব সংশোধনীর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অপরাধের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ, বিচার প্রক্রিয়ায় আসামিদের অধিকারের বিস্তৃতি, আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ এবং জাতিসঙ্ঘসহ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণের সুযোগ রাখা।

প্রতিবেদন উত্থাপনের জন্য জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে ধন্যবাদ জানিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিনিধি বলেছেন, এই প্রতিবেদন বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক এবং নির্যাতনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। বিক্ষোভকারীরা কর্তৃত্ববাদী সরকারের অবসান চেয়েছিল। ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ক্রাকডাউন ছিল নজীরবিহীন। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিরোধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি হত্যা ও গুমের মতো অপরাধ সংঘটিত করে আসছিল। আইন প্রয়োগের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি নির্দেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো কাজ করেছে। আর এর কারণ ছিল হয় প্রতিশোধের ভয় অথবা লাভবান হওয়া প্রত্যাশা। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বিচারহীনতার স্বাধীনতা উপভোগ করছিল।

অধিবেশনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত মায়ের ডাক সংগঠনের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, গুম হওয়ার পর আমার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের খোঁজ এখনো পাইনি। সে কি জীবিত আছে নাকি মারা গেছে আমার পরিবার তা বলতে পারে না। গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিশন গঠন করেছে। এ কমিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের বন্দী রেখে নির্যাতন করার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে।

সানজিদা ইসলাম গুম হওয়া ব্যক্তিদের খোঁজ দিতে এবং এ অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাইকমিশনারের সহযোগিতা চান।

জুলাই বিপ্লবের সাথে জড়িত এক নারী তার ভাইকে নিয়ে করুণ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও হাসপাতালে চিকিৎসা পায়নি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সে চারদিন অবর্ণনীয় কষ্টে কাটিয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন এ সময় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে বিক্ষোভকারীদের খোঁজ করছিল। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তার ভাইয়ের শরীর থেকে গুলি বের করে চিকিৎসা দিতে সক্ষম হয়েছে।

ফারহানা শারমিন নামে একজন মানবাধিকার কর্মী হতাহতদের সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।

প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণের কিছু ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে ধর্ম কোনো ইস্যু ছিল না। সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে কারো ওপর আক্রমণ করা হয়নি। তিনি জানান, বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসঙ্ঘ হাইকমিশনারের কার্যালয় স্থাপনের একটি প্রস্তাব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করছে।

ভলকার তুর্ক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াগুলোকে সমর্থন দেয়া প্রয়োজন। মানবাধিকারকে এসব সংস্কারের কেন্দ্রে রাখা হবে বলে ড. ইউনূস আমাকে জানিয়েছেন।