ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ

ইয়েমেনে দিশেহারা শিক্ষকরা

Printed Edition

আলজাজিরা

ইয়েমেনের সরকারি স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ সালেম প্রতিদিন সকালে শিক্ষকতা দিয়ে দিন শুরু করলেও তাকে দিনে মোট তিনটি কাজ করতে হয়। সকালে সরকারি স্কুল, দুপুরে বেসরকারি স্কুল এবং রাত পর্যন্ত একটি হোটেলে কাজ করে তিনি যখন বাড়ি ফেরেন, তখন তিনি পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ৩১ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, চতুর্থ কোনো কাজ করার সুযোগ থাকলে আমি সেটিও করতাম। ১০ বছর আগে তিনি যেখানে ৩২০ ডলার আয় করতেন, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩০ ডলারে।

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহী এবং সৌদি সমর্থিত সরকারের মধ্যকার গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের শিক্ষা খাত এখন ধ্বংসের মুখে। এক দিকে তেলের রফতানি বন্ধ, অন্য দিকে মুদ্রার চরম অবমূল্যায়নের ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। হাউছি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ২০১৬ সাল থেকে শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রয়েছে, আর সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেতন দিলেও তা অত্যন্ত নগণ্য এবং অনিয়মিত।

বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই

মোহাম্মদ সালেমের মতো হাজারো শিক্ষক এখন পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। সন্তানদের প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ বা গোশত দিতে না পেরে তারা এখন আলু আর পেঁয়াজ খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি ছুটির দিনে সন্তানদের দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে রাখতে বাধ্য করেন যাতে তারা সকালের নাস্তার কথা না বলে। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় ভেষজ চিকিৎসায় নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। নিজের এক সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে সেনাবাহিনীতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তিনি, যাতে কিছু বাড়তি টাকা উপার্জন করা যায়।

বিপন্ন ভবিষ্যৎ : জাতিসঙ্ঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ওচা-র ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের প্রায় ৬৬ লাখ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক কোনো বেতন পাচ্ছেন না। মারিব প্রদেশের শিক্ষক আলী আল সামায়ে জানান, যুদ্ধের আগে তার বেতন ছিল ১২০০ সৌদি রিয়াল, যা এখন কমে হয়েছে মাত্র ২০০ রিয়াল। পরিবারের জন্য খাবার কিনতে গিয়ে তিনি এখন বছরে মাত্র একবার তাদের সাথে দেখা করতে পারেন। এমনকি সামান্য দুধ কেনাও এখন তাদের কাছে বিলাসিতা।

বিক্ষোভ ও বিকল্প চেষ্টা

বেতন বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষকরা বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট পালন করছেন। কোথাও স্থানীয় প্রশাসন সামান্য কিছু ভাতার ব্যবস্থা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। মারিব প্রদেশে শিক্ষকরা এতটাই অভাবী যে স্থানীয় কৃষকরা তাদের বিনামূল্যে আলু, টমেটো দিয়ে সাহায্য করছেন। শিক্ষক ইউনিয়নের নেতারা বলছেন, শিক্ষকরা এখন ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক পরে স্কুলে আসছেন, যেখানে তাদের ছাত্রদের পকেটেই শিক্ষকের চেয়ে বেশি টাকা থাকে। অনেকে অনাহারে মারাও যাচ্ছেন।

অনিশ্চিত গন্তব্য

হাউছি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দমনের ভয়ে শিক্ষকরা সেভাবে মুখ খুলতে না পারলেও ক্ষোভ বাড়ছে সর্বত্র। দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী তারেক সালেম আল আকবারী জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে রাজস্ব কমে যাওয়াই বেতন না বাড়ার প্রধান কারণ। তবে শিক্ষকরা বলছেন, তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। যদি সম্মানজনক কোনো বিকল্প কাজ পান, তবে তারা শিক্ষকতা ছেড়ে দেবেন। মধ্যপ্রাচ্যের ইসরাইল ও ইরানের উত্তেজনার মতো ইয়েমেনের এই অভ্যন্তরীণ সঙ্কটও এখন চরম আকার ধারণ করেছে। শিক্ষকদের এমন করুণ দশা চলতে থাকলে দেশটির একটি পুরো প্রজন্ম অন্ধকারে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি লাশের ভার সইবার মতো শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই এই অবহেলিত কারিগরদের।