আসামে বিজেপির ‘ভূমিপুত্র’ রাজনীতিতে মুসলিমদের সংশয়
Printed Edition
আলজাজিরা
আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় ৪০ লাখ মুসলিম ভোটারকে পাশে পেতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু দলটির এই ‘আদিবাসী’ বা ‘ভূমিপুত্র’ তকমা দেয়ার কৌশল নিয়ে খোদ মুসলিমদের মধ্যেই তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
গত ১৪ মার্চ গুয়াহাটির উপকণ্ঠে ইসলামপুর গ্রামে প্রায় তিন ডজন বুলডোজার নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালায় প্রশাসন। এতে আকরাম আলীর মতো অনেক ‘গোরিয়া’ মুসলিমের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। আকরাম আলী আক্ষেপ করে বলেন, আমি এই মাটির সন্তান, ৪৭ বছর ধরে এখানে বাস করছি। তবুও কেন আমার বাড়ি ভাঙা হলো? আমরা কি মুসলিম বলেই আজ এই দশা?
বিজেপির নতুন কৌশল : ২০২২ সালে আসামের বিজেপি সরকার গোরিয়া, মোরিয়া, সৈয়দ, দেশী এবং জুলহা- এই পাঁচটি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘খিলঞ্জিয়া’ বা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সরকারের দাবি ছিল, তারা কেবল বাংলাভাষী মুসলিম বা ‘মিয়া’দের ওপর কড়াকড়ি করবে, আদিবাসীদের ওপর নয়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিকবার বলেছেন, বিজেপির মিয়াদের ভোটের প্রয়োজন নেই, কিন্তু খিলঞ্জিয়া মুসলিমরা তাদের পাশে আছে।
উচ্ছেদের আতঙ্ক : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এই বিভাজনের রাজনীতি করছে মূলত ভোটের স্বার্থে। বিশেষ করে উত্তর ও পূর্ব আসামের এমন কিছু আসন আছে যেখানে আদিবাসী মুসলিমদের ভোট জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত এক বছরে লখিমপুর বা গোলাঘাটের মতো এলাকায় শত শত গোরিয়া মুসলিম পরিবারকেও উচ্ছেদ করা হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া বা জমি থেকে সরিয়ে দেয়ার ভয় এখন সবার মধ্যেই কাজ করছে।
সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলা : আদিবাসী মুসলিম নেতারা বলছেন, বিজেপি কেবল উচ্ছেদ করেই ক্ষান্ত নয়, তারা আসামের মুসলিম ঐতিহ্যকেও মুছে ফেলতে চাইছে। সম্প্রতি ভারতের সাবেক মুসলিম রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদের নামে থাকা একটি মেডিক্যাল কলেজের নাম পরিবর্তন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ ছাড়া আসামের সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত সুফি সাধক আজান পীরের অবদান নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি। এমনকি ১৬০০ শতাব্দীর কিংবদন্তি মুসলিম বীর বাঘ হাজারিকাকেও তিনি ‘কাল্পনিক চরিত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আস্থাহীনতা : ইসরাইল বা বিশ্বের অন্যান্য সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকার মতো আসামের এই প্রান্তিক মানুষগুলোও এখন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তিত। ঘর হারানো আকরাম আলীর মতে, কাগজে-কলমে তাদের ‘ভূমিপুত্র’ বলা হলেও বাস্তবে তাদের সাথে ‘মিয়া’দের মতোই আচরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি ভেঙে আমাদের মেরুদণ্ড আগেই ভেঙে দেয়া হয়েছে। এখন আমরাই যেন নতুন ‘মিয়া’ হয়ে গেছি। হাউছি বিদ্রোহীদের মতো কোনো সশস্ত্র সঙ্ঘাত এখানে নেই ঠিকই, কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানে গৃহহীন হওয়া শত শত মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।