প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর

১৩ সমঝোতায় স্বার

Printed Edition
Font Page-1
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হয় : পিআইডি

- গ্রেট হলে রাজসিক অভ্যর্থনা

- সিপিসি ও বিএনপির মধ্যে চুক্তি

- তিস্তা প্রকল্পে ইতিবাচক সাড়া

- আজ শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ বেইজিং (চীন) থেকে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর ঢাকা-বেইজিং দ্বিপীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের েেত্র এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মোড় এনে দিয়েছে। চার দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরের তৃতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত েেত্র মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বারিত হয়েছে। বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক এবং এই চুক্তি স্বার কেবল দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকেই দৃঢ করছে না, বরং দণি এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।

সফরের প্রাপ্তি ও আতিথেয়তা সম্পর্কে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বেইজিংয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে গণচীন সরকার যে আন্তরিক ও রাজকীয় আতিথেয়তা প্রদান করেছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও অনুপ্রেরণার। বর্তমান সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে চীনের সাথে পারস্পরিক সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে এক নতুন যুগের সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।

গত ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত চার দিনের এই সরকারি সফরটি বাংলাদেশ ও চীনের বহুমাত্রিক মৈত্রীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই চলমান সফরে মূলত যেসব দ্বিপীয় ও আঞ্চলিক এজেন্ডা গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছেÑ চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে শীর্ষ বৈঠক, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যানের সাথে দ্বিপীয় আলোচনা, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অবকাঠামোগত ও নদী ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা।

চার দিনের ফলপ্রসূ চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ শুক্রবার বিকেলে বেইজিংয়ের ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ২৪ জনের একটি উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদল অংশ নিয়েছেন। প্রতিনিধিদলে রয়েছেনÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী। এ ছাড়া রয়েছেন তিনজন প্রতিমন্ত্রীÑ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেনÑ হুমায়ুন কবির, এ কে এম শামসুল ইসলাম, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহদী আমিন।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিতীয় বিদেশ সফর হলেও অত্যন্ত কৌশলগত। গত ২১ জুন তিনি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় যান। দুই দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষে গত সোমবার রাতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডাব্লিউইইফ) বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে চীনের ডালিয়ানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুই দিনব্যাপী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বুধবার বিকেলে বিশেষ ফাইটে রাজধানী বেইজিংয়ে এসে পৌঁছান তিনি।

গ্রেট হলে মা-বাবার মতোই রাজসিক অভ্যর্থনা

বেইজিংয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও সশস্ত্রবাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদান করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। গতকাল বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহকারে গ্রেট হলে এসে পৌঁছালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং তাকে উষ্ণ করমর্দনের মাধ্যমে স্বাগত জানান।

এরপর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একটি চৌকস দল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সশস্ত্র সালাম জানায়। এ সময় ব্যান্ড দলে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণভাবে বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয় এবং তোপধ্বনির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। সঙ্গীত শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং সশস্ত্রবাহিনীর বর্ণাঢ্য প্যারেড পরিদর্শন করেন। প্যারেড পরিদর্শন শেষে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের একে অপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। পরিচয় পর্বের পর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা পেরিয়ে দ্বিপীয় বৈঠক কে নিয়ে যান।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ ভবনসহ এর চার পাশের বিশাল চত্বর ও প্রধান সড়কগুলো বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় পতাকা দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়। উল্লেখ্য, এই ঐতিহাসিক ভবনেই চীনের সর্বোচ্চ আইনসভা ‘ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস’ (এনপিসি)-এর বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি চীনের রাষ্ট্রীয় কূটনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের এটি প্রথম চীন সফর হলেও বেইজিংয়ের সাথে তার সম্পর্ক বহু পুরনো। এর আগে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে তিনি চীন সফরে এসেছিলেন এবং সে সময়ও এই গ্রেট হলে লালগালিচা সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এই আবেগময় লিগ্যাসি স্মরণ করে বলেন, ‘২০০২ সালে তৎকালীন সফল প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে এসে এই বন্ধুভাবাপন্ন দেশ থেকে অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বাবা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রীর মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরে তার মা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় ও ফলপ্রসূ সফরের মাধ্যমে সেই দ্বিপীয় সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় সুদৃঢ করেন। মা-বাবার সেই রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত অংশীদারত্বকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’

১৩টি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বার

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ল্েয বৃহস্পতিবার বিকেলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বারিত হয়েছে। গ্রেট হলের চুক্তি স্বার কে বাংলাদেশের পে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব চুক্তিতে সই করেন। গতকাল সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ১৩টি সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

স্বারিত সমঝোতা স্মারকগুলোর প্রধান ত্রে : বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন : দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ‘গ্রিন ডেভেলপমেন্ট’ বা পরিবেশবান্ধব টেকসই শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা স্বারিত হয়েছে।

রফতানি সমতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ : চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং রফতানি সমতা বৃদ্ধির বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে।

সহজ শর্তে ঋণ : বাংলাদেশ যে সব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য চীন থেকে ঋণ গ্রহণ করছে, সেগুলোর সুদের হার কমানো, গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধের শুরুর সময়) বৃদ্ধি এবং নমনীয় শর্ত যুক্ত করার বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়েছে।

গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) : চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিা ও সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এমওইউ সই হয়েছে।

কৃষি পণ্য রফতানি (কাঁঠাল) : বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল সরাসরি চীনে রফতানির জন্য কোয়ারেন্টাইন ও শুল্কসংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রোটোকল চুক্তি স্বারিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার খুলবে।

শিা ও কারিগরি ভাষা শিা : বাংলাদেশের স্কুল কারিকুলাম বা বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে চীনা ভাষা ‘মান্ডারিন’ অন্তর্ভুক্তকরণ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিার মানোন্নয়নে দু’টি পৃথক শিা সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছে।

গণমাধ্যম ও থিংক ট্যাংক ফোরাম : তথ্য আদান-প্রদান এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন বাড়াতে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, জাতীয় সংবাদ সংস্থা ও প্রভাবশালী থিংক ট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে চারটি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প বিনিয়োগ : বিনিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপরে (বিডা) সাথে চীনের বিনিয়োগ বোর্ডের পৃথক চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যাপক চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হবে। সেখানে নতুন চীনা ফ্যাক্টরি ও প্রোডাকশন ফ্যাসিলিটি স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।

সিপিসি ও বিএনপির মধ্যে চুক্তি

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’-এ চীনের মতাসীন রাজনৈতিক দল ‘চায়না কমিউনিস্ট পার্টি’ (সিপিসি) এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় মতায় অধিষ্ঠিত দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-এর মধ্যে একটি ঐতিহাসিক দলীয় সমঝোতা স্মারক স্বারিত হয়েছে।

বিএনপির পে দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিং এই সমঝোতা স্মারকে স্বার করেন। এ সময় বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এই দলীয় সমঝোতার আওতায় দুই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, প্রতিনিধি দল বিনিময় ও রাজনৈতিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, জনগণের মধ্যে সংযোগ এবং তৃণমূলের জীবনমান উন্নয়নের েেত্র ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ত্রে তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সিপিসির শীর্ষ নেতারা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দীর্ঘদিনের যে লিগ্যাসি, তা এই চুক্তির মাধ্যমে আরো সুসংহত হবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রীর সাথে বৈঠক : তিস্তা প্রকল্পে ইতিবাচক সাড়া

সফরের অন্যতম প্রধান ও স্পর্শকাতর এজেন্ডা হিসেবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুওইংয়ের সাথে এক দ্বিপীয় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার প্রতিনিধি দল। গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা খ্যাত ‘তিস্তা নদী’সহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও খননে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য অর্জিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বন্যার ঝুঁকি মোকাবেলা, পরিবেশ সুরা এবং পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার ল্েয বাংলাদেশে চলমান জাতীয় নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেন। বিশেষ করে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নে চীনের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি। জবাবে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলেন, ‘২০০৫ সালে আমাদের মধ্যে স্বারিত সমঝোতাস্মারক এবং গত বছর চীনের পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের ধারাবাহিকতায় এই দ্বিপীয় সহযোগিতা সম্পূর্ণ বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর হবে। বাংলাদেশ চীনের দীর্ঘ দিনের নদী শাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারে।’

‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সম্মেলন ও প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের জোয়ার সৃষ্টি করতে গতকাল সকালে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এবং বাংলাদেশের ‘বিডা’র যৌথ উদ্যোগে বেইজিংয়ে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের বিজনেস সামিট অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে চীনের প্রায় ৮০টি প্রথম সারির বৈশ্বিক শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান, সিইও ও শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে তার মূল বক্তব্যে বলেন, ‘বর্তমান সরকার বাংলাদেশে ব্যাপক অর্থনৈতিক, আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার সাধন করছে। বাংলাদেশ এখন দণি এশিয়ায় উৎপাদন ও শিল্প খাতের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক গন্তব্য।’

বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার একটি ‘১৮০ দিনের বিশেষ দ্রুত কর্মপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করছে বলে তিনি জানান। প্রধানমন্ত্রী আরো ঘোষণা করেন যে, চীনের ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রথম ‘ইনভেস্টমেন্ট অফিস’ স্থাপন করা হচ্ছে এবং এখন থেকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে মাত্র ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্রদান করা হবে।

আজ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে শীর্ষ বৈঠক

সফরের শেষ দিন অর্থাৎ আজ শুক্রবার বেইজিংয়ের সময়ানুযায়ী সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল প্রতীতি দ্বিপীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, বাণিজ্য ভারসাম্য রা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। দুই শীর্ষ নেতার এই বৈঠক বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ভূরাজনৈতিক সুরায় অত্যন্ত ইতিবাচক ও যুগান্তকারী ফলাফল বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করছে দুই দেশের কূটনৈতিক মহল।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সাথে সাাৎ করবেন এবং চীনের ঐতিহাসিক জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। এরপর আজ বিকেল ৫টায় বেইজিং বিমানবন্দর থেকে বিশেষ বিমানে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।

উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তিতে বলেন, ‘দীর্ঘ দিন পর দেশের জনগণের প্রত্য ভোটে নির্বাচিত একজন গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিপুল মর্যাদা ও সম্মান পাচ্ছেন, তা সমগ্র বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের গৌরব। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণœ রেখে তিনি যেভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ডায়নামিক পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।’