মু ক্ত গ দ্য
কান্নাভেজা রাতের ধ্বনি
Printed Edition
দেলোয়ার হোসেন
ছায়ামায়া ঘেরা চোখ ধাঁধানো নীল আকাশ। মেঘ আর মেঘের দৌড়ঝাঁপ। হাওয়ায় হাওয়ায় বেজেছিল রিমঝিম বৃষ্টির সুর। কোলাহল মুখর উৎসবে মেতেছিল কাকডাকা ভোরের পাখিরা। কৃষাণীর হাঁসগুলো ফ্যাঁক ফ্যাঁক করে বের হচ্ছিল আর কদম কেয়ার সুবাস ছড়াচ্ছিল বাড়ির চারপাশ। শান্ত-স্থবির মুহূর্তে লুকানো সুর্যের হাসির শোভা পাচ্ছিল না সুবর্ণ রেখায়। বাড়ির সামনের পুকুরে পাতাবাহার বৃক্ষে বসে মাছরাঙাদের কলতান। স্নিগ্ধ কোমল সোনালী প্রহরের অঙ্কিত রঙ। মুক্তমনে উড়ন্ত প্রজাপতি। ওপারে শোনা যাচ্ছিল কাঁচামাটিয়া নদীর ঢেউয়ের কলকল ধ্বনি। সুন্দর মনোরম পরিবেশে মন মেতেছিল বারবার। ঘুমভাঙা মানুষগুলো ছুটে চলেনি তখনো আপন কর্মক্ষেত্রে। অন্যদের ন্যায় আমিও ছিলাম চঞ্চলহীন হৃদয়ে। স্বপ্নের কাননে সভ্যতার ফুল ফোটানোর কথা ভাবছিলাম প্রতি ক্ষণে ক্ষণে । ভালোবাসার আনন্দ দিনগুলো যে একদিন হারিয়ে যাবে সে কথাগুলো তো মনে হচ্ছিল না। ঘাতক ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে জীবনবৃক্ষ। আমিও বৃষ্টিভেজা সকালে জরুরি কাজের প্রতি তখন অধীর আগ্রহ ছিল। সবকিছু বাদ দিয়ে দ্রুত পড়ার টেবিলে ছুটে যাই। মনে পড়ে যায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা। পরম মমতায় যাদেরকে পাঠদান করাই, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করা আমার মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাড়ির কাজ ঠেলে দিয়ে আমিও প্রতিষ্ঠানের ক্লাসের পড়ার প্রতি মনোনিবেশ করি। এভাবেই অতিবাহিত হয় প্রায় দু’ঘণ্টা। তারপর ভাবলাম অবহেলার চোখ এখন আর কোথাও রাখা যাবে না। হিসেবের খাতা দেখে দেখে বাড়ির জরুরি কাজ দ্রুত সমাধান করতে হবে। সময় নষ্ট না করে বিরতিহীনভাবে কাজ করতে থাকি। এর মধ্যেই কাজের ফাঁকে হালকা একটু চা-নাশতা সেরে নিলাম। এভাবে জরুরি কাজ সেরে নেয়ার শেষ মুহূর্তে অন্য পরিস্থিতির শিকার। আহা! পোড়া কপাল। জানালার ফাঁক দিয়ে শুনি বাড়ির আঙিনায় এক লোক আমায় ডাকছে। প্রথমে আমি ডাক শুনিনি। পরে অন্য লোকের মাধ্যমে জানলাম, এক লোক আমার জন্য অপেক্ষমান। আমি জরুরি কাজগুলো স্থগিত রেখে দ্রুত ছুটে যাই। সেখানে পৌঁছামাত্রই গিয়ে দেখি আমি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত, সেই প্রতিষ্ঠানের পিয়ন আবুল বাশার। তার হাতে একটি খাতা ও একটি চিঠি। তাকে প্রথমে সালাম ও কুশলাদি বিনিময় করার পর বললাম। কী ভাই এতো সাত-সকালে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত কিছুইতো বুঝতে পারলাম না। পিয়ন একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আপনি আর প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে পারবেন না। এই নেন আপনি আপনার বহিষ্কারের চিঠি। একদল শকুন আপনাকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এত বড় অমানবিক তাণ্ডব গোটা সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। নিরীহ মানুষের ওপর যদি এভাবে আত্মসম্মানে করা হয় প্রশ্নবিদ্ধ বিবেকের আদালত। যা হোক হাতশ হবেন না স্যার। খোদা সাক্ষী থাকুক অপকর্ম কিছুতেই শুভ হবে না। এদের পরিণতি হবে খুব ভয়াবহ। একদিন খোদার হাতে পাঁকড়াও হবেই ইনশাআল্লাহ। পিয়নের কথা শুনে আমি ভীত সন্তস্ত্র হয়ে যাই। সারা শরীরে এক ধরনের কম্পন শুরু হয়। আমি তো এখন বড় অসহায়। বিপদের দিনে কেউ বুঝি প্রতিবাদ করার নেই। বুকের ধন কোমলমতি ছাত্র যদি আমাকে প্রশ্ন করে কোন কারণে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, তখন আমি কী জবাব দেবো ? সত্যের যে ভাত নেই এটা চিরন্তর সত্য কথা। বিমর্ষ-বিষণœ মনে চিঠি হাতে নিয়ে খুললাম, তারপর দেখলাম বহিষ্কারের চিঠিতে যা লিখছে কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। বহিষ্কার পত্রের লেখাগুলো আজগুবি, মিথ্যা, ভীত্তিহীন ও বানোয়াট। যারা এমন কর্মে লিপ্ত হয়েছে, এরা কখনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা রাখে না। পিয়ন আমাকে বলতে লাগল, আপনি বহিষ্কারপত্রে স্বাক্ষর করুন। আমি প্রচণ্ড ক্ষোভে লজ্জায় বহিষ্কারের পাতায় স্বাক্ষর করলাম। সেদিন থেকে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটতে লাগল। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এমন বর্বরোচিত ঘটনা।
২৭ জুলাই এক বেদনার দিন। ২০১৭ সালের ওই দিনে আমাকে কতিপয় স্বার্থবাদীরা মিথ্যা অপবাদে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুত করে। অথচ যেভাবে আমাকে লজ্জাজনকভাবে বহিষ্কার করা হয়, সেটি ছিল চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ভাবতে অবাক লাগে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কিরূপে আমার ওপর অমানবিক কাজ করতে পারল, একটু বুকও কাঁপেনি তাদের। শুধু তাই নয়, কতিপয় বিপথগামী ও সহযোগীরা হাজার ছাত্রকে এতিম করে আনন্দ উল্লাসে মেতেছিল। ভালোবাসার পৃথিবীতে এমন নির্মম আচরণ সুশীল সমাজের মুখে তীব্র আফসোসের দানা বাঁধে। অথচ করার কিছুই ছিল না। আমার পেছনে অশুভ শক্তির মহড়া ছিল খুব ক্ষিপ্র। আমি সেদিন চোখের জলে ভিজতে ভিজতে প্রতিষ্ঠানের আঙিনা ছাড়তে বাধ্য হই। লেখাপড়া সমাপ্তির পর আমাকে বেকারের বোঝা দীর্ঘ দিন পোহাতে হয়। আমার কত স্থানে ঘুরতে হয়েছে চাকরি নামক সোনার হরিণ ধরার জন্য। এরপর মেলেনি কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই। জীবন জীবিকার পথ রুদ্ধ থাকায় জীবনে ধেয়ে আসে বহুবার ঘাত-প্রতিঘাত। ভূমিধসের মতো তছনছ করে দেয় ফুলের মতো সুন্দর জীবনটাকে। অভাবের করাল গ্রাসে পড়ে স্বজন-বন্ধুহীন সময় কাটে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আশার কাননে নতুন ফুল ফোটে। জ্যোৎস্নার হাসির গল্পের মতো ধরা দেয় সাফল্যের চাবি। ময়মনসিংহ জেলাধীন একটি বৃহৎ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (জামিয়া গাফুরিয়া দারুসসুন্নাহ ইসলামপুরে) বাংলা শিক্ষক পদে নিয়োগ পাই। উল্লেখ্য, যে মেধা যাচাই বাছাইয়ের ভিত্তিতে আমাকে চাকরি দেয়া হয়েছিল। শিক্ষক পদে নিয়োগ পেলে তো কী হবে? পেছনে যে ভয়ঙ্কর বাঘে তাড়া করছে, কেউ কি একবার ভাবছে? আজ হোক, কাল হোক বাঘকে যদি কেউ লালন-পালন করে বা নিকটে বাস করে কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তবে বাঘের গ্রাসের কবলে পড়তেই হবে। চাকরিতে যোগদানের পর বেশ কয়েকটি বছর ভালোই কাটছিল । কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রতিহিংসার জালে আটকে যাই আমি। তৎকালীন প্রতিষ্ঠান প্রধান বিষাক্ত সাপের মতো হা করে চাকরি খাওয়ার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। একের পর এক ফন্দি কৌশল অবলম্বন করে। হঠাৎ কিছু স্বার্থান্বেষীর যোগসাজসে মিথ্যা চক্রান্তের জালে আবদ্ধ করে দেয়। অশুভ চক্রান্তের জাল থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় ছিল না আমার। অবশেষে চাকরি বিধি লঙ্ঘন ও বাস্তবিক সাক্ষী প্রমাণ ছাড়াই আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেয়। এমন অবৈধ বেআইনি পদক্ষেপে ক্ষোভে ফেটেছিল এলাকাবাসী। কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে তার প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি আজও।
আমার চলা-ফেরা উঠা-বসা ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। যেহেতু আমি সাহিত্য চর্চার প্রতি মনোনিবেশ করি, অযথা সময় নষ্ট করার কোনো প্রশ্নই আসে না। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। পাঠদান করাতাম শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত সাবলীল ও সুন্দর পরিভাষায়। আমি ছাত্রদের আদরের পরশ বিলিয়ে খুব ভালোভাবে বুঝাতাম। এমন ভালো কিছু করাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। ঘাতকদের তাইতো প্রশ্নবিদ্ধ কাজ করা সম্ভব হলো। উত্তমভাবে পাঠদানের জন্য অজস্র ছাত্র ভক্তের জন্ম নেয়। সে জন্য আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার পর প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের কান্নার রোল শোনা যায়। অনেকেই বুকফাটা কান্নায় বারবার মূর্ছা যেতে থাকে। আকাশ-বাতাস ভারী হয়েছিল হৃদয় বিদারক দৃশ্যে। সেদিন বুকফাটা আর্তনাদে ছাত্রদের মুখে বারবার উচ্চারণের ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। তারা বলতেছিল দেলোয়ার স্যার আমাদের প্রিয় স্যার, তাকে ছাড়া প্রতিষ্ঠানে কিভাবে লেখা পড়া করব? প্রিয় স্যারকে কিছুতেই ভুলতে পারব না । সেদিন হাজারো ছাত্রদের সান্ত্বনা দেয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি। প্রতিষ্ঠানের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে আইনের আশ্রয় নেইনি আমি। অসীম ধৈর্য নিয়ে নিজের ভাগ্যকে বরণ করে আমি মহত্ত্বের পরিচয় দেই। চাকরি থেকে বহিষ্কারের পর আমার জীবনে নেমে আসে চরম আঁধার। স্বাভাবিক রুজি রোজগারের পথ বন্ধ থাকায় খেয়ে না খেয়ে সাহিত্য সাধনা থেকে বিরত হইনি। বরং দরিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে যাই ধাপে ধাপে। জানা নেই আমার সংগ্রামী জীবন আর কতদিন এই কষ্ট পোহাতে হবে। প্রতি বছর ২৭ জুলাই ফিরে আসলে কান্নাভেজা রাতের ধ্বনি বেজে ওঠে।