তুলসী গ্যাবার্ডের মন্তব্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া
রিপাবলিকান পার্টির সাথে কাজ করার পরামর্শ
Printed Edition
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের বাংলাদেশ সংক্রান্ত মন্তব্য নানা মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এটিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামিক খিলাফত ধারণার সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যারা বাংলাদেশে আসছেন তারা সবাই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির সাথে আমাদের আরো জোরালোভাবে কাজ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীরাও ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ব্যাপারে সেন্টার ফর অল্টারনেটিভের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্প প্রশাসনে দায়িত্ব নেয়ার আগেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পও নির্বাচনে জেতার আগে এবং পরে বাংলাদেশ ইস্যুতে টুইট করেছেন। তুলসী গ্যাবার্ডের সাথে ভারতের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রাজনীতি থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই সংখ্যালঘু ইস্যুতে সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সম্পদের ওপর আক্রমণ নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়েছে। যে ক্ষমতায় থাকে সেসব সময় বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করতে চায়। আওয়ামী লীগ আমলেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনকারী প্রিয়া সাহা অভিযোগ করেছিলেন, তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান দেশ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে। তৎকালীন সরকার তা জোরালো প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবারো সরকার একটি রক্ষণাত্মক ভূমিকা নিয়েছে। বস্তুত আমাদের এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যাতে বলা যাবে যে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে না এবং সেটা দৃশ্যমান হতে হবে। কেননা দেশের বাইরে থেকে কেউ এ ব্যাপারে অভিযোগ তুললে তাতে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
গত আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পর থেকে ভারত সরকার ও সে দেশের গণমাধ্যম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে জোরালোভাবে প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বীকার করে নিয়েছে যে, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনরোষের কারণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে এবং এর মধ্যে কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও ছিল। কিন্তু এ সময় হিন্দুদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়নি। বরং রাজনৈতিক দলসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংশ্লিষ্টরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ভারতেও সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের অবস্থা বেশ খারাপ। তুলসী গ্যাবার্ড বাংলাদেশের এলে হয়তো এখানকার সাংবাদিকরা ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু গ্যাবার্ডের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের গণমাধ্যম এ প্রশ্ন তুলবে না। তবে আমাদের সমস্যাটা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। আমি দেখছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যারা বাংলাদেশে আসছেন তারা সবাই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটর, স্কলার বা থিঙ্কট্যাঙ্ক। এতে হয়ত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। এটা সঠিক কূটনীতি না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির সাথে আমাদের আরো জোরালোভাবে কাজ করা দরকার। রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর, স্কলার বা তাদের গণমাধ্যমকে আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নিয়ে প্রকৃত অবস্থা দেখানো দরকার। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীরাও ভূমিকা রাখতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ হলে ট্রাম্প ক্ষেপে যাবে, যা হিতে বিপরীত হবে।
এ দিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং ইসলামিক খিলাফতকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ড যে মন্তব্য করেছেন সেটি ‘গুরুতর’ বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তুলসী গ্যাবার্ডের বক্তব্য নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সেটাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান। তুলসী গ্যাবার্ড বক্তব্য গুরুতর।
গত সোমবার দিল্লিতে এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ সম্পর্কে তুলসী গ্যাবার্ড বলেছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্ভাগ্যজনক নিপীড়ন, হত্যা ও অন্যান্য নির্যাতন যুক্তরাষ্ট্র সরকার, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের উদ্বেগের একটি প্রধান ক্ষেত্র। ট্রাম্পের নতুন মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে আলোচনা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের হুমকি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বৈশ্বিক তৎপরতা একই আদর্শ ও লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই আদর্শ ও লক্ষ্য হলো ইসলামপন্থী খিলাফতের মাধ্যমে শাসন করা। তারা সন্ত্রাস ও অন্যান্য সহিংস পন্থায় এটা বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয়। এতে অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষের ওপরও প্রভাব পড়ে।
তুলসী গ্যাবার্ডের মন্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ও সুনামের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলাম চর্চার জন্য সুপরিচিত এবং চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। গ্যাবার্ডের মন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে করা হয়নি। তার বক্তব্যে পুরো বাংলাদেশকে অন্যায় ও অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশের মতো, বাংলাদেশও চরমপন্থার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারিত্বে আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সংস্কার এবং অন্যান্য সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আসছে। বাংলাদেশকে ভিত্তিহীনভাবে ইসলামিক খিলাফতের সাথে যুক্ত করার অর্থ হলো এ দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কঠোর পরিশ্রমকে খাটো করে দেখা, যারা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামিক খিলাফত ধারণার সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে সরকার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
তুলসী গ্যাবার্ড একজন মার্কিন রাজনীতিবিদ এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। তিনি গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বহুসংস্কৃতির পরিবারে বেড়ে ওঠা গ্যাবার্ড হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর নিপীড়নে তিনি সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি।