সীতাকুণ্ডু ও আমতলী পৌরবাসীর নানা দুর্ভোগ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
Gram-7-1
সীতাকুণ্ডুর পন্থিছিলা-শেখপাড়া সড়কের পাশে ময়লার স্তূপ (বাঁয়ে)। আমতলী পৌরসভার পাশে ময়লার ভাগাড় : নয়া দিগন্ত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু ও বরগুনার আমতলী পৌরবাসীর যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। পৌর সুযোগ সুবিধার অপ্রতুলতা ও বর্জ্য নিষ্কাশনে অনিয়মের কারণে পদে পদে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পৌরবাসীদের। বিশেষ করে পৌর সড়কগুলোতে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ ও বর্জ্যরে ভাগাড়ের কারণে চলাফেরায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পথচারীদের। জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের আগের প্রশাসন এ দুই পৌর এলাকার উন্নয়নের চেয়ে স্বেচ্ছাচারিতা, লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যের দিকেই নজর ছিল বেশি। ফলে নগরবাসীর সুযোগ-সুবিধা ও পৌর অবকাঠামোগত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এ দুই পৌর এলাকায়।

প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হলেও সীতাকুণ্ডু

পৌরবাসী তার সুফল পায় না

সীতাকুণ্ডু (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সরকারি সূচকে সীতাকুণ্ডু একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্ননয়নসহ একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার নাগরিকদের যেসব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না পৌরবাসী। প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত একটি আবর্জনার ভাগাড় তৈরি করতে পারেনি পৌর মেয়ররা। এখন পৌরসভার যাবতীয় আবর্জনা ফেলা হচ্ছে পন্থিছিলা-শেখপাড়া এলাকায় মহাসড়কের পাশের খোলা জায়গায়। এতে করে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি এ স্থানে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে।

প্রতি বছর বাজেটে পৌর কর বাড়ানো হলেও বাড়েনি নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নও ঘটেনি। ১৯৯৬ সালে পৌরসভার যাত্রা শুরুর পর থেকে বিএনপি সমর্থিত একজন মেয়র দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন করলেও বাকি ২৫ বছর আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়ররা উন্নয়নের চেয়ে লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি।

জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী সমর্থিত মেয়র ও কাউন্সিলর পালিয়ে গেলে পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব পান সীতাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আগে ব্যাপক লোটপাট ও বর্তমানে অর্থ সঙ্কটের কারণে অনেকগুলো চলমান প্রকল্পের কাজ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: নুরুন্নবী বলেন, বর্তমানে সল্প আকারে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হলেও অর্থাভাবে বৃহৎ আকারের কাজগুলো করা যাচ্ছে না।

পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডে পন্থিছিলার বাসিন্দা নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৯ বছর পার হয়ে গেলেও পৌরবাসীর কোনো মানোন্নয়ন হয়নি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পৌরসভার সমস্ত ময়লা আবর্জনা আমার বাড়ির পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এ আবর্জনার দুর্গন্ধে পথচলা দায়। বর্ষাকালে এখানকার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়। ফলে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আবর্জনাগুলোর স্তূপ বড় হতে হতে এক সময়ে মহাসড়কের ওপরে উঠে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তখন ঘটে ছোট বড় নানা দুর্ঘটনা। গত দুই বছরে প্রাণ গেছে অন্তত তিন ব্যক্তির। বিষয়টি সমাধানে পৌর কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বেশ কয়েকবার লিখিতভাবে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সুরাহা মেলেনি।

৫ নং ওয়ার্ড ভূঁইয়া পাড়ার শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ভূঁইয়াপাড়া সড়কটির কার্পেটিং করার জন্য ইটের খোয়া বসানো হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্পেটিং করা হয়নি। রাস্তায় একটি কালভার্ট ভেঙে আছে। সেটিও মেরামত করা হয়নি। এসব কারণে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

১ নং ওয়ার্ড এয়াকুব নগরের বাসিন্দা দিদারুল আলম বলেন, প্রতি বছর পৌর করের বোঝা বাড়লেও বাড়ে না নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা। এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষার পানি জমে বন্যার সৃষ্টি হয়। বাসাবাড়িতে পানি ওঠে।

সীতাকুণ্ডু পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে যে নাগরিক সুবিধা পাওয়ার কথা সেটি নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। এছাড়া পৌরসভার নিজস্ব কোন জায়গা না থাকায় স্বাস্থ্যসম্মত ময়লার ভাগাড়ও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি এরই মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এলে ভাগাড় তৈরির কাজটিও শুরু করা হবে।

মহাসড়কের পাশে আমতলী পৌরসভার ময়লার ভাগাড়

আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে আমতলীর উতশিতলা নামক এলাকায় খোলা স্থানে পৌরসভার ময়লা ফেলা হচ্ছে। পচা দুর্গন্ধে দূষিত হচ্ছে এলাকা পরিবেশ। সড়কের চলাচলকারী মানুষ নাক চেপে ধরে এলাকা পার হতে হচ্ছে। দ্রুত এ ময়লার বাগাড় সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আমতলী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালে ২৩ আগস্ট। বিগত এই ২৭ বছরে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ আধুনিক বর্জ ব্যবস্থাপনা ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পৌরসভা কর্র্তৃপক্ষ শহরের বিভিন্ন স্থান ও নদীতে ময়লা ফেলে আসছে। গত তিন মাস ধরে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের আমতলীর উতশিতলা নামক স্থানে ময়লা ফেলছে। এতে ওই স্থানটি ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এ মহাসড়ক পথে প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। এছাড়া ভাগাড়ের চারিদিকে রয়েছে গ্রামাঞ্চল। ফলে গ্রামের বাসিন্দারা পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় লিটন গাজী ও রাসেল মৃধা বলেন, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ মহাসড়কের পাশে ময়লার ভাগাড় বানিয়ে রেখেছে। দ্রুত এই ভাগাড় অপসারণের দাবি জানাচ্ছি।

আমতলী পৌরসভার বর্জ ব্যবস্থাপনা পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম জাকির মৃধা বলেন, পৌরসভার নিজস্ব কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

আমতলী পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, ময়লার ফেলার ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে হলে অন্তত ৮-১০ কোটি টাকার প্রয়োজন। ওই পরিমাণ টাকা পৌরসভায় বরাদ্দ নেই। অর্থ সঙ্কুলান হলে আধুনিক বর্জ ব্যবস্থাপনা ডাম্পিং স্টেশন করা হবে।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: চিন্ময় হাওলাদার বলেন, পৌর বর্জের দূষিত পরিবেশে ‘বায়ুবাহিত রোগ জীবাণু’ ছড়ায়। মশা-মাছির বংশবিস্তার হয়।

আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পৌর প্রশাসক মো: রোকনুজ্জামান খাঁন বলেন, আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) পৌরসভার সভায় পৌর ভাগাড় ও ডাম্পিং স্টেশন নিয়ে আলোচনা করা হবে।