কৌশলগত গতিপথ
সার্বভৌম ভারসাম্য নাকি নতুন নির্ভরতার ফাঁদ?
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
২০২৬ সালে বাংলাদেশ একটি স্পষ্ট কৌশলগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ একদলীয় শাসনের অবসান, অন্তর্বর্তী সরকারের উত্থান এবং ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও ‘জাতীয় সনদ’-এ ঘোষিত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই নয়, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনে ২০২৬ সাল হয়ে উঠছে বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্তমূলক বছর। প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘বাংলাদেশ কোন জোটে থাকবে’ তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, নাকি পুরনো নির্ভরতার নতুনরূপে আটকে পড়বে?
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা : অবস্থানগত সুবিধা ও ঝুঁকি : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ২০২৬ সালে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল- সবকিছুর সংযোগস্থলে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাংলাদেশকে দেখছে একটি সমুদ্র নিরাপত্তা ও সাপ্লাই চেইন হাব হিসেবে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে। ভারত আবার বাংলাদেশকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও সংযোগ রাজনীতির কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই তিন শক্তির ভিন্নমুখী কৌশল ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ যেমন তৈরি করছে, তেমনি চাপও বাড়াচ্ছে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক : নির্ভরতা থেকে পুনঃসমীকরণের চেষ্টা : ২০২৬ সালে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবচেয়ে সংবেদনশীল কৌশলগত ইস্যুগুলোর একটি। শেখ হাসিনা সরকারের সময় গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ কিন্তু অসম সম্পর্কের উত্তরাধিকার বহন করছে বর্তমান সময়। নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ আমদানি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতকেন্দ্রিক নীতিতে আবদ্ধ ছিল। ২০২৬ সালে এই সম্পর্ক পুনঃসমীকরণের চেষ্টা দৃশ্যমান। তিস্তা পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ- এসব ইস্যু নতুন করে সামনে আসছে। বাংলাদেশ এখন আর নিঃশর্ত ঘনিষ্ঠতার পথে নয়; বরং স্বার্থভিত্তিক, সমমর্যাদার কূটনীতির দিকে ধীরে এগোচ্ছে।
চীনের সাথে সম্পর্ক : ঋণ-উন্নয়ন-নিরাপত্তার ত্রিভুজ : চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ২০২৬ সালে কেবল অর্থনৈতিক নয়, ক্রমেই কৌশলগত রূপ নিচ্ছে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি খাতে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সাথে ঋণনির্ভরতা ও কৌশলগত অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে চীনের সাথে সম্পর্ককে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে সীমাবদ্ধ রাখতে, সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে না জড়াতে। এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়’ নীতিরই ধারাবাহিকতা।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব : গণতন্ত্র বনাম কৌশল : ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করেছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নির্বাচন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের ভূমিকাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা।
বাংলাদেশ এখন আর সরাসরি কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার অবস্থানে নেই। বরং তারা চাইছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জলবায়ু অভিযোজন এবং সমুদ্র নিরাপত্তায় সহযোগিতা, কিন্তু সামরিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৌশলগত সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে কতটা নীতিনির্ভর কিন্তু সার্বভৌম রাখা যায় তার ওপর।
রোহিঙ্গা সঙ্কট : কৌশলগত বোঝা : রোহিঙ্গা সঙ্কট ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত বোঝা। এটি শুধু মানবিক নয়, নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তা বাংলাদেশের কৌশলগত পরিসর সঙ্কুচিত করছে। ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ কেবল মানবিক আবেদন নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ কৌশল গ্রহণের দিকে ঝুঁকছে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতি : নীরব রূপান্তর : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর চলছে। আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা এবং সমুদ্র নিরাপত্তায় জোর দেয়া হচ্ছে। তবে এটি আক্রমণাত্মক নয়, বরং প্রতিরক্ষামূলক প্রতিরোধভিত্তিক।
সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখা এখন কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। ২০২৪ পরবর্তী অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে- অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো কৌশলগত নীতি টেকসই হয় না।
অর্থনীতি ও কৌশল : বিচ্ছিন্ন নয় : ২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এলডিসি উত্তরণ, বাণিজ্য চুক্তি, সরবরাহ চেইন ও জ্বালানি নিরাপত্তা- সবই কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ। বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে অর্থনৈতিক দুর্বলতা মানেই কৌশলগত দুর্বলতা। তাই অর্থনৈতিক সংস্কার, বৈদেশিক ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও রফতানি বৈচিত্র্য এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা-২০২৬ সালে বাংলাদেশের কৌশলগত গতিপথ কোনো একমুখী জোট রাজনীতির দিকে নয়। এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের পথ-যেখানে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত এটিই- বাংলাদেশ কি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে, নাকি ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতায় আবারো একটি নির্ভরশীল ভূখণ্ডে পরিণত হবে?
২০২৬ সাল এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয়ার সূচনাবর্ষ। যদি রাজনৈতিক ঐক্য, কূটনৈতিক দক্ষতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা একসাথে কাজ করে, তবে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।