যুদ্ধবিরতির বার্তায় ফের চাঙ্গা পুঁজিবাজার
বন্ড ছেড়ে ১২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে সিটি ব্যাংক
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ মন্দায় ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজার নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর যখন ইতিবাচক ধারায় ফেরার চেষ্টায় ছিল তখনই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। আবারো নতুন করে মন্দার কবলে পড়ে পুঁজিবাজার। থমকে যায় পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা। কিন্তু মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঘোষণায় আবার আশার আলো জ¦লে উঠেছে পুঁজিবাজারে যার প্রতিফলন ঘটেছে গতকালের লেনদেনে। আবার গতি ফিরে পেয়েছে বাজারের লেনদেন ও সূচক। আর এরই ফলে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন আবার হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একদিনেই পুঁজিবাজারটির প্রধান সূচকের উন্নতি ঘটে ১৬১ দশমিক ০৮ পয়েন্ট তথা ৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ভয়াবহতার সময়ও বিনিয়োগকারীরা যে বাজারের সাথে ছিলেন তার প্রমাণ গতকালের লেনদেন ও সূচকের চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে মন্দায় আটকে থাকা বাজারে আবার স্বস্তি ফিরে এলো। বিনিয়োগকারীরা আবার নতুন করে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজাবে। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো দীর্ঘদিনের হারানো পুঁজির কিছুটা হলেও ফিরে পাবেন। তবে তারা মনে করেন, বাজার যখন ভালো পারফর্ম করে তখন বিনিয়োগকারীদের উচিত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা। কারণ ভালো বাজারে সবসময়ই ভালো তথা মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোই প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় থাকে। আর মন্দায় তৎপর হয়ে ওঠে কারসাজিকারীরা। তাই নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হলে যৌক্তিক ও বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। আর তা করতে না পারলে পুঁজিবাজার কোনো অবস্থাতেই টেকসই হতে পারবে না।
বুধবার সকালে লেনদেনের শুরু থেকেই দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৬১ দশমিক ০৮ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ৫ হাজার ১৫৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩১৭ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে। লেনদেন শুরুর প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যে প্রধান সূচকটি ৫ হাজার ৩০০ পয়েন্টে পৌঁছে যায়। এ পর্যায়ে সাময়িকভাবে সূচকটি নি¤œমুখী আচরণ করলেও দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠে। দিনের বাকি সময় একই গতি ধরে রাখলে বড় উন্নতি দিয়ে দিন শেষ করে বাজারটি। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৫৪ দশমিক ৬৮ ও ৩০ দশমিক ১৬ পয়েন্ট।
অনেকটা একই ধরনের আচরণ ছিল চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেরও (সিএসই)। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩৩৪ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ১৪ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ১৪ হাজার ৮২৪ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩২১ দশমিক ২২ ও ১৯৬ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট।
সূচকের এ উন্নতি ঢাকা শেয়ার বাজারের লেনদেনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ডিএসই গতকাল ৯৯১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৯৪ কোটি টাকা বেশি। এটি বিগত ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে ডিএসইর সর্বোচ্চ লেনদেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারির পর দেশের প্রধান এ পুঁজিবাজারের লেনদেন আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী কয়েক দিন বাজারের গতি ভালো থাকায় ওই সময় হাজার কোটি টাকা ছাড়ায় ডিএসই্র লেনদেন। লেনদেন কিছুটা বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। এ দিন এখানে ৩১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। আগের দিন বাজারটির লেনদেন ছিল ২৬ কোটি টাকা।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিটি ব্যাংক পিএলসির ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের ১০০৭তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভা শেষে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় বিএসইসি। একই সভায় কমিশন যমুনা ও ট্রাস্ট ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোর জন্য ইতঃপূর্বে অনুমোদন করা যথাক্রমে ৮০০ ও ৫০০ কোটি টাকার বন্ডের জন্য সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএসইসি থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সিটি ব্যাংকের অনুমোদিত বন্ডটি হবে আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, ফুললি পেইড আপ, ফুললি রিডিমেবল এবং কুপন বিয়ারিং সাব-অর্ডিনেটেড প্রকৃতির। বন্ডটির মেয়াদ হবে সাত বছর। এর কুপন রেট নির্ধারিত হবে রেফারেন্স রেট বা বেঞ্চমার্ক রেটের সাথে ৩ শতাংশ কুপন মার্জিন যোগ করে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে এই বন্ড ইস্যু করা হবে। এর সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হতে পারে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি এবং মিউচুয়াল ফান্ডগুলো।
এই বন্ডের প্রতি ইউনিটের অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সিটি ব্যাংক তাদের করপোরেট, রিটেইল এবং এসএমই খাতে ঋণ প্রদানের কাজে ব্যয় করবে। বন্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ইবিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। যৌথভাবে অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্স লিমিটেড ও আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে লেনদেনের সুবিধার্থে বন্ডটি অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্তে এই অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
কমিশন সভায় যমুনা ব্যাংক পিএলসির আট শত কোটি টাকা মূল্যের নন-কনভার্টিবল, আনসিকিউরড, ফুলি রিডিমেবল, ফ্লোটিং রেট সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডের সম্মতিপত্রের মেয়াদ এবং ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি এর ৫০০ কোটি টাকা মূল্যের আনসিকিউরড, নন-কনভার্টিবল, রিডিমেবল, ফ্লোটিং রেট সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড এইটের সম্মতিপত্রের মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষবারের মতো মেয়াদ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মূল সম্মতিপত্রের অন্যান্য শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে।