দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত-পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকে একে-অপরের জানি দুশমন। সেই শত্রুতার আজও অবসান ঘটেনি। ব্রিটিশদের কাছ থেকে সাতচল্লিশে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক বিরাজ করছে। এখনো তা স্বাভাবিক নয়। মাঝে মধ্যে শত্রুতা রীতিমতো সঙ্ঘাতে রূপ নেয়। এর অবশ্য ঐতিহাসিক কার্যকারণ রয়েছে। শুরুতে কাশ্মির নিয়ে বিরোধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশ। তখন এর মীমাংসা গিয়ে গড়ায় জাতিসঙ্ঘে। বিশ্বসংস্থা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কাশ্মিরে গণভোটের প্রস্তাব পাস করে। সেই প্রস্তাব দুই দেশ মেনে নিলেও ভারত পরবর্তী সময়ে আর গণভোটের দিকে এগোয়নি। ফলে কাশ্মির বিরোধপূর্ণ ভূমি হিসেবে রয়ে গেছে। উপরন্তু হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার ওয়াদা ভঙ্গ করে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়। বাস্তবে কাশ্মিরিদের বড় একটি অংশ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই করছে।

এই বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মিরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলায় গত মঙ্গলবার অন্তত ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। হামলার প্রতিক্রিয়ায় বুধবার ভারতের তরফে সার্ক ভিসা স্কিমের অধীনে পাকিস্তানিদের ভিসা দেয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সাথে এ ভিসার অধীনে ভারতে থাকা পাকিস্তানিদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। একই সাথে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আটারি স্থলসীমান্ত বন্ধের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয় ভারত। পাশাপাশি দুই দেশের হাইকমিশনে কর্মকর্তা কমানো ও ফিরে যাওয়াসহ একাধিক নির্দেশনা দেয়া হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানও প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি স্থগিত এবং ওয়াগা সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা বৃহস্পতিবার দিয়েছে ইসলামাবাদ। ভারতের সাথে সবধরনের বাণিজ্য স্থগিতের পাশাপাশি নয়াদিল্লিকে পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের সাথে বাণিজ্য করতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। তা ছাড়া ভারতীয় উড়োজাহাজের জন্য আকাশসীমা বন্ধেরও ঘোষণা এসেছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্যে পরিস্থিতি সীমিত থাকছে না। পহেলগামের ঘটনাটি সাজানো নাটক বলেছে ইসলামাবাদ। অন্য দিকে সর্বদলীয় বৈঠকে জাতীয় প্রয়োজনে সবাই এক থাকার কথা জানিয়েছে ভারত সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবদমান দুই পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় দাবানলের মতো অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে। সেই আগুনে পুড়বে এ অঞ্চলের সব মানুষ।

আমরা ভারতশাসিত কাশ্মিরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার নিন্দা জানাই। একই সাথে এ নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক ঘটনার সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হোক। তার আগে কাউকে দোষাপোর থেকে বিরত থাকাই যুক্তিযুক্ত। আমরা এটিও মনে করি যে, যুদ্ধ কোনো সমস্যার টেকসই সমাধান নয়। সঙ্গত কারণে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিরোধের সমাধান শান্তিপ্রিয় মানুষের কাম্য। আমরাও তাই চাই। এ ক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের পথ বেছে নিতে হবে।