বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন প্রবাসীরা এখনো অবহেলিত। তারা প্রাপ্য সম্মান পান না। এমনকি তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তাদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃশমান অগ্রগতি নেই। সংশয় দেখা দিয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা ভোটাধিকার পাবেন কি না।

প্রবাসীদের ভোটাধিকার বিষয়ে গত মঙ্গলবার ইলেকশন কমিশন (ইসি) একটি সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে আলোচনা থেকে বোঝা যায়, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো যেমন প্রবাসীদের ভোটের আওতায় আনতে জোরালো দাবি জানাচ্ছে না, তেমনি ইসিও চলছে ধীরগতিতে। সেমিনারে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে কোন পদ্ধতিতে প্রবাসীরা ভোট দেবেন। এজন্য পোস্টাল, অনলাইন ও প্রক্সি ভোটের বিষয় প্রস্তাব আকারে এসেছে। ইসির পক্ষ থেকে ভোটদান পদ্ধতিগুলোর সুবিধা অসুবিধা নিয়ে একাধিক উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রায় সব রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে পরে ইসির কাছে লিখিত মতামত তুলে ধরবে বলে জানায়। সেমিনারে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলোর আলোচনায় বোঝা যায়, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা কেউ যথেষ্ট আন্তরিক নন।

বিদ্যমান পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ পদ্ধতি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। এমনকি পদ্ধতিটি ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত কোনো প্রবাসী ভোট দেননি। জনসংখ্যার বিশাল এ অংশ একবারও ভোট দিতে পারেনি। প্রক্সি ভোটের বিষয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আপত্তি করা হয়েছে। যেখানে জালভোট প্রদান ও ভোট চুরির অভ্যাস আমাদের রয়েছে; সেখানে প্রক্সি ভোট জালিয়াতির আরেকটি সুযোগ তৈরি করবে। এতে প্রবাসীদের মতামতের উল্টো প্রতিফলন ঘটাতে পারে। এই প্রস্তাব সমর্থনযোগ্য নয়।

হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, প্রবাসীদের সংখ্যা নিয়ে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার নেই। নিশ্চিতভাবে কারো জানা নেই প্রকৃত প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা কত। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর হিসাবে প্রবাসীদের সংখ্যা এক কোটি ৪৮ লাখের বেশি। বিগত সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দাবি করেছিলেন, বিদেশে কর্মরত প্রবাসীর সংখ্যা এক কোটি ৫৫ লাখ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান প্রবাসীদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব উপস্থাপন করে। এদের উপস্থাপিত সংখ্যায় বড় আকারের ফারাক দেখা যায়। প্রবাসীদের সংখ্যা শুধু ৫৫ লাখ এমন হিসাবও রয়েছে। প্রবাসীদের নিয়ে আমাদের অবহেলা যে কতটা এর প্রমাণ তাদের সংখ্যা নিশ্চিত না জানা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে প্রবাসীদের প্রকৃত সংখ্যা কত তার একটি তালিকা প্রণয়ন দরকার। অচিরে এ ধরনের একটি তালিকা করতে হবে যার ওপর নির্ভর করা যাবে। তা না হলে তাদের ভোটাধিকার অধরাই থেকে যাবে।

প্রবাসীদের দেশের প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলনে তাদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এখন সময় এসেছে তাদের মূল্যায়নের। এ জন্য তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটি করা সহজ। আশঙ্কা রয়েছে, এ সরকার চলে গেলে প্রবাসীরা আবারো গুরুত্বের তালিকা থেকে হারিয়ে যাবেন। তাই ইসিকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।