দেশের রাস্তা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মান বজায় না রাখা, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ঢাকাসহ সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) ৩৬টি কার্যালয়ে একযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানকালে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় একটি বিদ্যালয় ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশের চটা ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। কয়েকটি জেলায় সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার, বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের এমন অভিযান প্রশংসনীয়।

দুর্নীতি ও উন্নয়ন নিয়ে নানা তাত্তি¡ক আলোচনা থাকলেও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেশের রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভাট নির্মাণে দুর্নীতি যেন ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে গেছে। প্রকল্প মানেই টাকা আর টাকা। যত বড় প্রকল্প তত বেশি টাকা। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা। ত্রিপক্ষীয় আঁতাতের মাধ্যমে এসব দুর্নীতি করা হয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনীতিক; আমলা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং ঠিকাদার।

একটি অধিদফতরকে কেন্দ্র করেই যদি এত টাকার দুর্নীতি হয় তাহলে সব মন্ত্রণালয় মিলে কত লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে তা আমাদের কল্পনার বাইরে। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনীতিকদের সায় ছাড়া অন্যরা দুর্নীতি করার সাহস পেতে পারে না।

ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। পালিয়ে গেছে দলটির সভানেত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও অন্যান্য নেতাকর্মী। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সুযোগ এসেছে দেশের রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে খতিয়ে দেখা। একই সাথে এসবের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া।

এতেও দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য শিকড়ে হাত দিতে হবে। জনমনে নীতি ও নৈতিকতার বোধ তৈরি করতে হবে। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ও উপযোগী কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নীতিবোধশূন্য আদর্শহীন মানুষ তৈরির অনুকূল শিক্ষা কারিকুলাম বর্জন করতে হবে। তা হলেই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে। একই সাথে শাসনব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইংরেজ শাসনের আগে দেশে ব্যাপক দুর্নীতি ছিল না। তাদের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয়। দুদক সংস্কারের বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশমালা জমা দিয়েছে দুদক সংস্কার কমিশন। গ্রহণযোগ্য সুপারিশগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হলে আগামী দিনে দুদক দুর্নীতি দমনে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনে সক্ষম হতে পারে।