ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে চলছে। অত্যধিক গরমে জনজীবনে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। এদেশে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে বেশি গরম থাকে। এপ্রিলে গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং মে মাসে ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে তাপমাত্রা শুধু বেড়েছে।
১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু গত বছরের মে মাসে দেশের তাপমাত্রা ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে। এর আগে ১৯৯৫ সালের ১ মে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত শনিবার দেশে এ বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় চুয়াডাঙ্গায়, ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকার ছিল ৪০ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডোর গবেষণায় বলা হয়েছে, গত প্রায় চার যুগে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই গড় তাপমাত্রা আরো দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে।
ঋতু বৈশিষ্ট্যের জন্য বাংলাদেশকে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর দেশ বলা হয়। এখানে এক সময় যেমন শীতকালে শীতে মানুষের জবুুথবু অবস্থা হতো, তেমনি বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে চারদিক থৈ থৈ করত। একইভাবে গরমকালেও তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমায় বজায় থাকত। কিন্তু এখন অবস্থা এমন হয়েছে, ঋতুর বৈশিষ্ট্য দেখে খুব কম বোঝা যায় আমরা কোন মৌসুমে বাস করছি।
জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রার তারতম্য হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ কি শুধু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফল? নিশ্চয় তা নয়। আমাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে দেশের তাপমাত্রা বাড়ছে।
একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্যে আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি হিসাবে, আমাদের বনভূমি আছে ১৫ শতাংশ। কারো মতে, বনভূমির পরিমাণ ৮-৯ শতাংশ। এখনো আমরা বনভূমি ধ্বংস করে বাড়িঘর নির্মাণসহ উন্নয়নকাজ করছি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎপ্রকল্প নির্মাণ ছিল পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের হটকারী একটি সিদ্ধান্ত। যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবেশ ধ্বংসের একটি বড় আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় জলাভূমির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু জলাভূমিতে নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতেও পরিবেশের ধ্বংস ডেকে আনছি আমরা।
এদিকে ঢাকা সবসময় যেন এক উষ্ণ নগরী। এ শহরের স্থাপনাগুলো গড়ে তোলার সময় নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। দেখা হয়নি নগরীর পরিবেশগত দিক। যে কারণে রাজধানীতে সারা বছর গরম লেগে থাকে।
এদেশ আমাদের। এখানকার বাস উপযোগী পরিবেশ আমাদের রক্ষা করতে হবে। শাসকশ্রেণী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী কিংবা প্রশাসনের কেউ যদি পরিবেশের ক্ষতি করতে উদ্যত হয়; তা আমাদের দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোসহ জনসাধারণকে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়; বরং প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে হবে সবাইকে।