চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পর এবার উজানের ঢল আর বৃষ্টিতে ফের পানি বেড়েছে তিস্তা অববাহিকায়। এ নিয়ে চলতি বছরে সপ্তমবারের মতো বাড়ল এই নদীর পানি। ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল বিনষ্ট হয়েছে। অগণিত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র মতে, শুধু রংপুর অংশে ২০টি পয়েন্টে ভাঙন ধরেছে। আর তিস্তার দু’পাড়ে ২৪২ কিলোমিটার অববাহিকায় অন্তত দেড় শতাধিক স্থানে এবার ভাঙন ধরেছে।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও অর্থনীতির সাথে তিস্তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই নদী বর্ষায় প্রায়ই রূপ নেয় দুর্ভোগের প্রতীকে। উজানের ঢল এবং অতিবৃষ্টিতে তিস্তা অববাহিকায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনে প্রতি বছর হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নদী ব্যবস্থাপনার অভাবে এমন ঘটছে।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলেছে, তিস্তা অববাহিকার অনেক এলাকায় নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙনে বসতভিটা বিলীন হয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে বাঁধ, সড়ক কিংবা উঁচু স্থানে। মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় আমন চাষসহ বিভিন্ন ফসল বিনষ্ট হয়েছে। গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ এবং গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনের শিকার এলাকার দিশেহারা পরিবারের পাশে এখন পর্যন্ত দাঁড়ায়নি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মাঠপ্রশাসন।
দুর্যোগের সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি দেয়। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন এবং ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব প্রতি বছর একই সঙ্কট ফিরিয়ে আনে। কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করাও পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে। ফলে দুর্যোগের মাত্রা আরো বাড়ছে।
তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এর পানিপ্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা আঞ্চলিক সহযোগিতার সাথেও সম্পর্কিত। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, তথ্য বিনিময় বাড়ানো এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা আবশ্যক। কিন্তু উজানের দেশ ভারতের অনীহায় বিষয়টি ঝুলে আছে। তবে একই সাথে দেশে নদী খনন, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ, আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ আমাদেরই করতে হবে।
তিস্তা অববাহিকার মানুষের দুর্ভোগ শুধু বর্ষাকালের সংবাদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানবিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুনরুদ্ধার সহায়তা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ সরকারকে নিতে হবে। একই সাথে নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় অধিবাসীদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিস্তাপাড়ের অধিবাসীদের জীবন-জীবিকা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাময়িক ত্রাণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তাহলে প্রতি বছরের পুনরাবৃত্ত এই প্লাবন ও ভাঙনের অভিশাপ থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষ কিছুটা হলেও মুক্তি পাবেন।