প্রান্তিক মানুষের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ১৯৯৮ সালে শুরু হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। ২০০৯ সালের পর এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। এ উদ্যোগ শুরু হয় সরকার ও স্থানীয় জমিদাতাদের সমন্বয়ে। কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রায় ৩০ প্রকারের ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু এসব পরিকল্পনার কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
গতকাল নয়া দিগন্তের খবর থেকে জানা গেছে, চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ ও জনবলের চরম সঙ্কট চলছে। খবরটি উদ্বেগের। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা লাভে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই গ্রামের মানুষের ভরসার জায়গা। কারণ, শহরের মতো হাত বাড়ালেই সেখানে ডাক্তার পাওয়া যায় না। দেশে অনেক চিকিৎসক তৈরি হলেও তারা গ্রামে থাকতে চান না। এজন্য ক্লিনিকগুলোর কার্যকর থাকা জরুরি। এতে অনেক রোগ-বালাইয়ের প্রতিকার গোড়া থেকেই করা সম্ভব হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর ওপর চাপ কমবে। এর ধারাবাহিকতায় রোগীদের জটিল সমস্যা নিয়ে শহরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটতে হবে না। শহরের হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে যাবে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে ছয় দিন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) এবং তিন দিন করে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীর উপস্থিত থাকার কথা। অথচ বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিএইচসিপি একাই কোনোমতে ক্লিনিক টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কোথাও ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে ক্লিনিক তালাবদ্ধ থাকছে। সেবার সুফল যেখানে মানুষের দরজায় পৌঁছে দেয়ার কথা, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও অবহেলা গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা আরো ভঙ্গুর করে তুলছে।
এখন কর্মীদের উপস্থিতির চেয়েও বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে ওষুধের অভাব। আগে যেখানে ৩২ পদের ওষুধ মিলত, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২২ পদে; আর বাস্তবে অধিকাংশ সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে রোগীদের। আলসারের সামান্য ওষুধ কিংবা প্রাথমিক অ্যান্টিবায়োটিকও দরিদ্র মানুষকে ফার্মেসি থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে কিনতে হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায়, মানুষ এখন আর ক্লিনিকমুখী হন না। ক্লিনিকে গেলে দেখা যায়, মূল দরজায় তালা ঝুলছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি মাসে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন। এই আশ্বাস ইতিবাচক হলেও কার্যত কতটা বাস্তবে পূরণ হবে তা বলা মুশকিল।
গ্রামীণ জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সচল রাখার বিকল্প নেই। অবিলম্বে ওষুধ ও জনবল সঙ্কটের সমাধান করা হবে এটাই প্রত্যাশিত। আমরা আশা করি, মতলব উত্তরের সবকটি ক্লিনিকে চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ওষুধ সরবরাহ অবিলম্বে নিশ্চিত করা হবে। যথাযথ তদারকির মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টানতে হবে। এজন্য উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের পক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আবার সক্রিয় ও কার্যক্ষম করে তোলা সরকারের জরুরি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।