আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় আইনি হাতিয়ার ছিল ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনগুলো। এসব কালো আইনেই জনগণের কণ্ঠ রোধ করা হয়, মতপ্রকাশের ন্যূনতম সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। কথা বললেই মামলা, গ্রেফতার, হয়রানি- এমনকি গুম খুন পর্যন্ত করা হয়। গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে স্বৈরাচারী সরকারের সব অন্যায় অত্যাচার, দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলতে পারেনি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের নারকীয় শাসনে এভাবেই জনগণের মুখে তালা ঝুলিয়ে, গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কালো আইন করে, নির্বিচার গণহত্যা চালিয়েও হাসিনা নিজের পতন ঠেকাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে, দেশ ছেড়ে তস্করের মতো পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর, নৃশংস খুনি একনায়ক।

অন্তর্বর্তী সরকার স্বৈরাচারী হাসিনার তৈরি সর্বশেষ সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর সব কালো ধারা গত মঙ্গলবার বাতিল করেছে। আমরা সর্বান্তকরণে তাদের স্বাগত জানাই।

আইন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, কথা বলা বা মতপ্রকাশের কারণে হাসিনার কালো আইনে যেসব মামলা করা হয়েছিল তার প্রায় সবই আপনাআপনি বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়া যেসব মামলা জামিনযোগ্য ছিল না সেগুলোকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে।

আগের আইনের যে ৯টি ধারা বাতিল করা হয়েছে তার মধ্যে আছে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় শহীদ বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কিত বিদ্বেষ বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণার অজুহাতে দণ্ড দেয়ার বিধান। এসব ধারায় গত দেড় যুগে সারা দেশে লাখ লাখ মামলা হয়েছে, অসংখ্য মানুষকে হয়রানি জুলুম-নিপীড়ন ও হত্যার শিকার হতে হয়েছে। অনেক সাংবাদিক এ ধরনের মামলার ভুক্তভোগী হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে- এমন কোনো কনটেন্ট প্রকাশের দায়েও অসংখ্য মামলা হয়েছে। সেগুলোও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে।

নতুন কিছু ধারা সংযোজন করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ শিগগিরই জারি করা হবে। এতে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রথমবারের মতো মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যা আবশ্যিক ছিল। এর ফলে কোনো স্বৈরশাসকই আর কখনো ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে জনগণকে দমনের সুযোগ পাবে না। সাইবার স্পেসে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো বিষয়ও প্রথমবারের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এটিও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

এর পরও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দমনমূলক কোনো বিধি সাইবার নিরাপত্তা আইনে থেকে গেলে তা পুনর্বিবেচনার দরকার হতে পারে। এমন কিছু পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে আসবে। এমনকি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকেও। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্বিচার গণহত্যার প্রামাণ্য ও জলজ্যান্ত বাস্তবতা অস্বীকারের প্রবণতাও এরই মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। নিশ্চয়ই বিষয়গুলো সচেতন মানুষের নজর এড়ায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুভ উদ্যোগেরও ত্রুটি খুঁজবে কেউ কেউ। কারণ, সরকারকে বিতর্কিত করতে নানা মহল এখনো সচেষ্ট। তবে এটিও সত্য, যেকোনো সংস্কারে সরকারকে ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে।