দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দীর্ঘদিন প্রায় বন্ধ ছিল। পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পুরো জনবল ও সরঞ্জাম অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী স্বৈরচার শেখ হাসিনার সরকার নিজস্ব উদ্যোগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে বিদেশ থেকে তরল গ্যাস আমদানিতে প্রাধান্য দেয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের জন্য বিশেষ সুবিধা করে দেয়াই ছিল এর কারণ। এ ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ছিল না। মূলত পতিত সরকারের সময়ে পুরো জ্বালানি খাত লুটপাটের আঁখড়ায় পরিণত হয়। সংসদে দায়মুক্তি আইন পাস করে একের পর এক কুইক রেন্টাল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। স্বদেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে বিদেশী কোম্পানির সাথে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে আওয়ামী সরকার।
গ্যাসেও ছিল একই অবস্থা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি করা হয় ১২ হাজার কোটি টাকার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার। রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন লোপাট ছিল নজিরবিহীন। ২০২৩-২৪ সালের পুরো সময় গ্যাসের অভাবে সব কল-কারখানা ধুঁকছিল। ইউরিয়া উৎপাদনে ধস নামে। গার্মেন্টসহ অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য হয়নি কারণ, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা স্বৈরাচারের পক্ষ নেন। মিডিয়াও সেলফ সেন্সরশিপের নীতি অনুসরণে বাধ্য হয়। সরকারের লুটপাটের নীতির কারণে দেশের অর্থনীতিতেও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হয়। রিজার্ভ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যায়। নিত্যপণ্য আমদানিতে এলসি খোলার মতো ডলার সরবরাহেও ব্যর্থ হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অথচ সে সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজি আমদানির পরিবর্তে দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাতে কান পাতেনি সরকার। তবে আমদানির অর্থ জোগাতে না পেরে ২০২১ সালে গ্যাস অনুসন্ধানের কিছু উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। নয়া দিগন্তের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৫টি কূপ অনুসন্ধান ও খননকাজ চলছে। সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতায় দুই হাজার ৬৯৮ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়সাপেক্ষ এসব প্রকল্প ২০২৬ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা। গ্যাসের বিদ্যমান সঙ্কট নিরসন ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এসব প্রকল্প সহায়ক হবে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা যাচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি থেকে আসছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ঘাটতি ১৩০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাস খাতে জরুরি পরিস্থিতি বিরাজ করছে বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আমদানিনির্ভর। সম্প্রতি এক হাজার ৬২০ কোটি টাকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত। ২০টি থেকে নিয়মিত গ্যাস তোলা হয়। বিদ্যমান মজুদে বর্তমান হারে ব্যবহার করলে আগামী ৯-১০ বছর চলতে পারে। সুতরাং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, দেশে নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। তাই বাপেক্সের জনবল ও সরঞ্জাম সক্রিয় ও সচল করা এবং এটিকে সমুদ্রে অনুসন্ধান চালানোর মতো সক্ষম করে তোলা দরকার। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানে জোর দেওয়া, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও আধুনিক অনুসন্ধান কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। সেইসাথে নীতিগত সংস্কার ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার বিকল্প নেই। একই সাথে জ্বালানির বিকল্প উৎস সন্ধানে সচেষ্ট হওয়াও দরকার।