চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। অবস্থা এমন যে, অর্থের অভাবে অনেকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন। জনমুখী স্বাস্থ্যনীতির অনুপস্থিতি এর জন্য দায়ী। স্বাস্থ্য খাতের এমন অবস্থা কাটিয়ে উঠতে অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সেই কমিশন গত সোমবার এক গুচ্ছ সুপারিশ-সংবলিত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে।

স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে আমাদের সরকারগুলো বছরের পর বছর বরাদ্দ কম দিয়ে চলেছে। প্রকৃত চিত্র হলো দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের সবচেয়ে বরাদ্দ কম। এতে করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে ৭০ শতাংশ ব্যয় পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।

রাষ্ট্র বা সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় স্বাস্থ্য খাত যে নেই, তার প্রমাণ বাজেট বরাদ্দ। গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাতীয় বাজেটের গড়ে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয় স্বাস্থ্যে। অন্য দিকে জিডিপির অংশ ২ শতাংশ কখনো ছাড়ায়নি। অথচ নীতিনির্ধারকদের ভালোই জানা আছে, জনমুখী, সহজলভ্য ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এটি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন প্রস্তাব করেছে, স্বাস্থ্যে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নিম্নআয়ের মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি সংবিধানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইনি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া দরকার।

বাস্তবে বাংলাদেশ এখনো একটি ন্যায্য, মানবিক ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গঠনের পথে দৃশ্যমান বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দুর্নীতি, সক্ষমতার ঘাটতি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং চিকিৎসাশিক্ষার নিম্নমান ভবিষ্যতের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে। লক্ষণীয়, কমিশনের আইনবিষয়ক কিছু সংস্কার ছাড়া বাকি প্রায় সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থ প্রয়োজন। বাজেট বরাদ্দ কম রেখে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা যাবে না। তাই বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে টেকসই অর্থায়নের কিছু সুপারিশ করেছে কমিশন।

সঙ্গতকারণে প্রয়োজন স্বীকার করে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে হবে সরকারকে। এতে সেবা বিস্তৃত হবে, ব্যক্তিগত ব্যয় কমবে, জনগণের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। আমাদের স্মরণে রাখা দরকার, বিশ্বব্যাপী যেসব দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে এগিয়ে আছে, সেসব রাষ্ট্র স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বা তার বেশি ব্যয় করে।

আশির দশকে প্রণীত ওষুধনীতি দেশের ওষুধশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও উন্নতি এনেছে। এতে আমরা ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। আমাদের ওষুধ কারখানাগুলো অভ্যন্তীণ চাহিদার ৯৮ শতাংশ উৎপাদন করে। তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষ ওষুধ পায়। ঠিক তেমনিভাবে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন যে সুপারিশমালা দিয়েছে; তা গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করলে দেশের স্বাস্থ্য খাতেও আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে আমাদের মনে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকে পণ্য হিসেবে না দেখে সেবা হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়তে হবে। একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের এটিই করা উচিত। তাই স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা, স্বাস্থ্যসেবায় পৃথক কমিশন গঠন ও সেবা বিকেন্দ্রীকরণের মতো যেসব গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব করেছে সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার পদক্ষেপ নেবে, এটিই প্রত্যাশিত।