জনশক্তিকে মানবসম্পদে উন্নীত করতে শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। সমকালীন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে যেকোনো দেশের উন্নয়নে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় জোর দেয়ার বিকল্প নেই। অর্থাৎ বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। না হলে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারব না। বাস্তবে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান যেমন তলানিতে, কারিগরি শিক্ষার অবস্থা তার চেয়েও শোচনীয়। এ কথা বলা অমূলক হবে না যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরে নিজস্ব একটি উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
বৃত্তিমূলক হওয়া সত্ত্বেও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের কারিগরি শিক্ষার অগ্রগতি হয়নি। তার প্রমাণ, এ শিক্ষায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। যেখানে দেশে সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আসন আছে এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি, সেখানে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন মাত্র ৬৯ হাজার শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এক লাখের বেশি আসন ফাঁকা রয়েছে। এই যে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ভাটা পড়েছে; এর পেছনে বিদ্যমান কারণগুলোর অন্যতম, শিক্ষাজীবন শেষে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান না হওয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ও জার্মানি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তারপরও দেশ দু’টি আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে যথাক্রমে তৃতীয় ও পঞ্চম শক্তি। এদের বিস্ময়কর উন্নতির প্রধান সোপান আর কিছু নয় কারিগরি শিক্ষা।
লক্ষণীয়, জাপানে কারিগরি শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ আর জার্মানিতে ৭১ শতাংশ। দেশ দু’টির শিক্ষাক্রম আধুনিক তথা শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক। শুধু এই দু’টি দেশ নয়, আরো অনেক দেশের উন্নতির প্রধান সোপান কারিগরি শিক্ষা। কিন্তু আমাদের অবস্থা ভিন্ন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থী মাত্র ১৬ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতায় দেশে কারিগরি শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। অথচ আমাদের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা এবং বৈশ্বিক চাহিদার আলোকে কারিগরি শিক্ষা অতি মূল্যবান। যেখানে সাধারণ শিক্ষিতদের বিদেশে চাহিদা নেই। সেখানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের দেশে ও বিদেশে কদর রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) জরিপ বলছে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ডিগ্রি সম্পন্ন করে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।
সার্বিক বিবেচনায় বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কারিগরি তথা কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজনানুগ। তাই এ শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। অতঃপর ২০৪০ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে মোট শিক্ষার কমপক্ষে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা অত্যাবশ্যক। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শুধু হার বাড়ালেই হবে না, একই সাথে মানও বাড়াতে হবে। দেশের কারিগরি শিক্ষাকে বিশ্বমানের করতে হবে। কারণ, মানহীন শিক্ষা মূল্যহীন। কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি সব কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সব শূন্য পদ অবিলম্বে পূরণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া, সব ল্যাবরেটরি সচল করা অপরিহার্য। না হলে কারিগরি শিক্ষার মান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেয়া সম্ভব হবে না।