স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশ পুরো প্রস্তুত নয়। এ ক্ষেত্রে যেসব ঘাটতি আছে নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনরা সেগুলো অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেন এবং এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করতে জাতিসঙ্ঘকে অবিলম্বে অনুরোধ করার আহ্বান জানান।
গত বুধবার রাজধানীতে এক সেমিনারে বক্তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা এবং অপর্যাপ্ত ও অনির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের কারণে এই উত্তরণ জনস্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদে গভীর নেতিবাচক প্রভাবের মুখোমুখি করতে পারে।
দেশকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার কিভাবে চরম লুটপাটের মহোৎসব চালিয়েছে জাতি তা দেখেছে। মূলত তাদের উন্নয়নের ফাঁকা বুলি ছিল চোরতন্ত্র চিরস্থায়ী করতে জনগণের চোখে ধুলা দেয়া। সেটি তারা করেছে বিশাল বিশাল মেগা প্রকল্প দিয়ে। নির্বিচারে বিদেশী ঋণ নিয়ে একেকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনের চেয়ে তিন বা চারগুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করেছে। দেশের অর্থনীতি আদৌ এসব ঋণের বোঝা বহন করতে পারবে কিনা সেটি ভাবেনি। মানুষের মুখ বেঁধে এবং অর্থনৈতিক খাত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূচক ও পরিসংখ্যান এবং জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য-উপাত্ত বিকৃত করে উন্নয়নের জোয়ার দেখিয়েছে।
সেই আওয়ামী সরকারেরই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল দেশকে এলডিসি তালিকা থেকে বের করে আনার। এ জন্য দলীয় অনুগত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে বানোয়াট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রচারণা চালানো হয়। এসব প্রচারণায় উত্তরণ হলে দেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধিসহ কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে সেগুলো বড় করে দেখানো হয়, কিন্তু সমস্যার দিকগুলো চেপে রাখা হয়। আর এসব করেই তারা পাঁচ দশক ধরে জাতিসঙ্ঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের সব আয়োজন সম্পন্ন করে।
অথচ এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে ৫০ বছর ধরে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-সুবিধাসহ নানা সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান অগ্রগতির মূল কারণ এটিই। দেশের অন্যতম সেরা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান একান্ত আলাপচারিতায় বলেছিলেন, যেকোনো সময় এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। কিন্তু অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর না দাঁড়ানো পর্যন্ত আমরা সে পথে এগোবো না। এটিই খাঁটি দেশপ্রেমিকের অবস্থান হওয়া উচিত।
এখন আওয়ামীমুক্ত পরিবেশে আওয়ামী মহলের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বুধবার ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ : প্রস্তুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক গোলটেবিলে সেটিই ঘটেছে।
বক্তারা বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত সংস্কার, বৈচিত্র্যময় বাজার কৌশল এবং রাজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উত্তরণের ফলে অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হতে পারে। তারা সুনির্দিষ্ট করে আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের কথা বলেননি। তবে তারা যখন বলেন, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি দুর্নীতিতে জর্জরিত এবং পোশাক খাতের বাইরে আমাদের রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রায় শূন্য তখন এ জন্য কারা দায়ী তা অস্পষ্ট থাকেনি। বিষয়টি খানিকটা স্পষ্ট করেছেন বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, উন্নয়নের ফাঁপা বয়ান, ভুয়া পরিসংখ্যান, ভেঙে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রফতানির ভিত্তি বিপজ্জনকভাবে সঙ্কীর্ণ অবস্থায় আছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতি এলডিসি থেকে উত্তরণের অনুকূল বলে আমরা মনে করি না। তাড়াহুড়ো করে উত্তরণ কাম্য নয়।