হাসিনার নিষ্ঠুর শাসনে হাজারো মানুষ গুম-খুন ও নানামাত্রিক পীড়নের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে নির্দয়তা ও বিপন্ন হয়েছে গুমের শিকার পরিবার। তাদের নিয়ে হাসিনার সহযোগীরা নির্মম রসিকতা করেছে। কখনো বলেছে দায়দেনা থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেছে, কখনো বলেছে ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয়েছে। হাসিনা নিজেও গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে বারবার নাটক করেছেন। তাদের নিকটাত্মীয় পরিবার-পরিজনকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছেন। যখন তিনি জানতেন যে, গুম হওয়া ওই সব ব্যক্তিকে তার বাহিনী হত্যা করে ফেলেছে। ৫ আগস্ট হাসিনা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা পালিয়ে গেলেও গুমের শিকার অনেকে ফেরেননি তাদের পরিবারে। গুমসংক্রান্ত তদন্ত ও বিচারকাজ নিয়েও আশাপ্রদ অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

গুমের শিকার স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ রোববার রাজধানীতে একটি অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সেখানে হারানো প্রিয়জনের ছবি বুকে নিয়ে হাজির হয়েছেন অনেকে। সরকারবিরোধীদের নিশানা করে গুমের পরিকল্পিত অভিযান শুরু করেছিলেন হাসিনা। এ জন্য প্রথমে যোগ্য, শক্তিশালী ও জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতাদের নিশানা করা হয়। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী ও ঢাকার একটি ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে দিয়ে গুমের শুরু হয়। অবস্থান কর্মসূচিতে হাজির অনেকে গুম হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সন্তান। যাদের শৈশবে বাবারা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এখন তারা কৈশোর যৌবনে পদার্পণ করেছে। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়টা তাদের কেটেছে হারানো বাবার ছবি বুকে নিয়ে দুঃখ কষ্টে।

এই স্বজনরা অবস্থান কর্মসূচি থেকে প্রশ্ন তুলছেন, আয়নাঘরে এখন কোনো লোক নেই, তাহলে গুম হওয়া আমাদের স্বজনরা কোথায়! বাস্তবতা হচ্ছে- গুপ্ত কারাগার অনুসন্ধানে একধরনের জড়তা আমরা দেখতে পেয়েছি। বিশেষ করে আয়নাঘর নামে কুখ্যাত কারাগারগুলোতে তদন্তদলকে নানাভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানকে আয়নাঘর পরিদর্শনে সাত মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময়ে গুপ্ত কারাগারগুলোর আলামত নষ্ট করা হয়েছে। তার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। গুম কমিশনের কাছে এক হাজার ৭০০ অভিযোগ পড়েছে। এর মধ্যে আগস্ট বিপ্লবের পরও ১৫৩ জন ফিরে আসেননি। তাদের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে তা পরিষ্কার নয়। অবস্থান কর্মসূচিতে পরিবারের সদস্যরা কাঁদছেন। এই কর্মসূচি থেকে তারা প্রশ্ন রাখেন- বিচারের জন্য এখনো কেন তাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। ৫ আগস্টের পর অনেক কিছুতে অগ্রগতি হলেও গুমবিষয়ে তদন্ত ও বিচারকাজ অনেকটা ঝিমিয়ে চলছে। এ ব্যাপারে সরকারের আড়ষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয়। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কোথা থেকে বাধা আসছে তা সরকারকে সামনে আনতে হবে।

সরকারের গঠিত গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন দাখিল করেছে। আশা করা যায়, এর সাথে জড়িতদের অনেকটা শনাক্ত করা গেছে। এর পরের কাজ ছিল অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা। সেখানে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, উল্টো গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা আতঙ্কে আছেন। এর মূল কারণ হচ্ছে, গুমের সাথে জড়িতরা বাহিনীগুলোতে রয়ে গেছেন। সরকারের উচিত অভিযুক্তদের বাহিনীগুলো থেকে আলাদা করা। এতে করে বাহিনীগুলো অভিযোগ থেকে মুক্ত হবে। সব বাহিনীর খুব সামান্য একটি অংশ হাসিনার কুখ্যাত গুমবাহিনীর সদস্য ছিলেন। গুটিকয়েকের জন্য বিশাল বাহিনী দায় নিতে পারে না।