বিশ্বে আত্মমর্যাদাশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলে যেকোনো জাতিকে তার নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে হয়। সেই সাথে তা টেকসই ও সময়োপযোগীও হতে হয়। যাতে পৃথিবীর অপরাপর জাতি-গোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। তাই দেখা যায়, যাদের শিক্ষাব্যবস্থা যত বাস্তবভিত্তিক তাদের জাতীয় উন্নয়ন হয় দ্রুত। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা সহসা ক্ষুণ্ন হয় না। দুর্ভাগ্য আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের দুর্বলতায় এখনো আমরা নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে পারিনি। যা-ওবা ছিল তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন স্বৈরাচার হাসিনা। যার খেসারত পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে।
স্বৈরাচারের আমলে জাতির ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয় নিজস্ব তাহজিব-তমদ্দুন বর্জিত বিজাতীয় সংস্কৃতিতে ভরা শিক্ষাক্রম। এ নিয়ে শুরু থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা ছিলেন প্রতিবাদমুখর। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সরকার সব প্রতিবাদ-সমালোচনা উপেক্ষা করে বিতর্কিত সেই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে। মূলত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে প্রতিবেশী দেশের সুবিধা করে দিতে ওই শিক্ষাক্রম পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নে জনমত উপেক্ষা করে ডিমভাজি আলুভাজি আর বিজাতীয় শিক্ষাক্রম জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে ভিনদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নের গভীরতম ষড়যন্ত্রের ছক এঁকেছিল ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে আগের বিতর্কিত শিক্ষা কারিকুলাম বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পূর্বের পাঠ্যপুস্তক বাতিল করে মাধ্যমিকের সব বই পরিমার্জনের নির্দেশনা দেয়া হয়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এনসিটিবির মাধ্যমে মাধ্যমিকের বই নতুন করে পরিমার্জন করা হয়। প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু আধেয় সংযোজন-বিয়োজন করা হয়।
২০২৫ সালের মাধ্যমিকের পাঠ্যবই ২০১২ সালের কারিকুলামে ফিরে যায়। তবে ২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে ফের পরিবর্তন আসছে। মাধ্যমিক এবং প্রাথমিকের পাঠ্যবই নতুন কারিকুলামের আলোকে লিখিত হয়ে ২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষ থেকে পুরোপুরি নতুন এবং পরিবর্তিত কারিকুলামে বাস্তবায়নের চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।
পাঠ্যবইয়ের নতুন কারিকুলাম বিষয়ে এনসিটিবির সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রিয়াজুল হাসান বলেন, যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে এর একটি রূপরেখা এনসিটিবি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। সেই রূপরেখার আলোকে বেশ কিছু কাজ এগিয়ে নেয়া হয়েছে।
আমাদের সবার জানা, শিক্ষা হচ্ছে যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড আর এ মেরুদণ্ডের ভিত্তিভূমি হচ্ছে সময়োপযোগী ও প্রায়োগিক জ্ঞাননির্ভর জাতীয় শিক্ষাক্রম। প্রকৃত বাস্তবতায় শিক্ষাক্রম একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। জাতীয় স্বার্থে ধারাবাহিকভাবে এতে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের সবার সুচিন্তিত মতামত নিয়ে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করাই হলো জাতীয় দায়িত্ব। এতে যুক্ত করতে হবে বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও অভিভাবক প্রতিনিধিদের। কেবল তখনই একটি যুগোপযোগী ও টেকসই শিক্ষাক্রম জাতিকে উপহার দেয়া সম্ভব ।