স্বাস্থ্যসেবায় নার্সিং অপরিহার্য। চিকিৎসকের সাথে রোগীর সেবায় নার্সের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা খাত তেমন পিছিয়ে আছে বলা যাবে না। সরকারি চিকিৎসাকাঠামোর তুলনায় বিগত তিন দশকে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা এগিয়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাসপাতাল-ক্লিনিক। সেই অনুপাতে নার্সের সংখ্যা ও সেবা দেয়ার মান এবং বেতন বাড়েনি। বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলে অবহেলিত থেকেছে নার্সিং খাত। এ ছাড়া নার্সিংয়ের রয়েছে দেশে-বিদেশে অপার সম্ভাবনা। তাই নার্সিংয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন; বিশেষ করে নীতিপ্রণয়ন ও তদারকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবায় তিন লাখ ১০ হাজার ৫০০ নার্স ও মিডওয়াইফ প্রয়োজন। পক্ষান্তরে রয়েছে এক লাখ তিন হাজার ১৫১ জন। প্রয়োজনের ৩৪ শতাংশের কম। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের হিসাবে প্রতি বছর ৩৬ হাজার ২৪০ জন নার্সিংয়ে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে ১২ হাজার নার্স ও মিডওয়াইফ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। দেশ-বিদেশে এ খাতে দক্ষ শ্রমশক্তির ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও কেন বাকিরা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন না তা একটি বড় প্রশ্ন।

২০২১ সালের পর দেশে সরকারিভাবে নার্স নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এদিকে দেশের হাসপাতালগুলোতে নার্সের জন্য কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। তারা ডাক্তার ও রোগী কিংবা তাদের স্বজনদের দুর্ব্যবহারের শিকার হন। এ জন্য রোগীর সেবাদানকারী ৯২ শতাংশ নার্স কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। আবার ৯৬ শতাংশ নার্স উপযুক্ত বেতন পান না। তাদের জন্য নেই ছুটি ও প্রয়োজনীয় বিশ্রামের ব্যবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হালনাগাদ প্রতিবেদন, পৃথিবীতে এখন ২৯ কোটি নার্স এবং দুই কোটি ২০ লাখ মিডওয়াইফ রয়েছে। বার্ধক্যের হার বেড়ে যাওয়া ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনে ২০৩০ সালে বিশ্বে সাড়ে পাঁচ কোটি নার্স ও ৩১ লাখ মিডওয়াইফের ঘাটতি দেখা দেবে।

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এ দেশের শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ বেকার। তাই নার্সিং পেশায় বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশ-বিদেশের চাহিদা সামনে রেখে নার্সিং শিক্ষায় পেশাগত মান অর্জনে বাংলাদেশ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। প্রথমত দেশের চাহিদা মেটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। সে জন্য কাজের পরিবেশে মান বজায় রাখা এবং উপযুক্ত বেতনের ব্যবস্থা করতে হবে। নজর দিতে হবে নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকেও। শিক্ষার মান ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পড়াশোনা শেষে সেবামূলক পেশাটি জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন শিক্ষার্থীরা। যেসব প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারবে না সেগুলোর অনুমোদন বাতিল করতে হবে। সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া যাবে না। যাতে বিদেশেও অনায়াসে নার্স হিসেবে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা নিয়োগ পেতে পারেন।

সরকারি নীতিসহায়তা পেলে দক্ষ নার্স তৈরি করা সম্ভব। এতে একদিকে দেশের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে বিদেশেও নার্স পাঠানো যাবে। তাই দেশের বেকার সমস্যার সমাধানে নার্সিং ভূমিকা রাখতে পারবে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে স্বাস্থ্যনীতিতে গুরুত্বারোপ করবে বলে আমরা আশা করি।