বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি স্থলবন্দরে গত রোববার ভারতগামী পণ্যবাহী শত শত ট্রাক আটকা পড়ে। ট্রাকগুলো পণ্য খালাস করতে পারেনি। স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ভারত সরকার গত শনিবার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এ অচলাবস্থা দেখা দেয়। তিনটি ছাড়া সব স্থলবন্দরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। লক্ষ্য স্পষ্ট। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে স্থলপথে পণ্য পাঠাতে পারবে না বাংলাদেশ।

বিষয়টি পুরোপুরি একতরফা। এর আগে গত ৮ এপ্রিল ভারত আকস্মিকভাবে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে। বাংলাদেশকে বিমানপথে বাড়তি ব্যয়ে তৈরী পোশাক রফতানি শুরু করতে হয়। গত ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে। এরপর এক মাস না পেরুতে গত শনিবার নতুন নিষেধাজ্ঞা দিলো দেশটি। সহজে অনুমেয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্থলবেষ্টিত সাত রাজ্যের সাথে বাণিজ্য সহযোগিতার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সব দেশের উন্নয়নের কথা বলেছেন। বিষয়টি অযাচিত হস্তক্ষেপ ভাবছে অনুদার ভারত। সার্ক অকার্যকর করাও এই হীনম্মন্যতাজনিত।

বর্তমান দ্ব›েদ্বর সূচনা বাংলাদেশ করেনি। করেছে ভারত। গত আগস্টে দিল্লির তাঁবেদার আওয়ামী সরকারের পতন থেকে এর সূচনা। আধিপত্য অব্যাহত রাখাই তার লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে দেশটি গত অর্ধশতাব্দী ধরে যৌথ নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে ভাতে ও পানিতে মারার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।

আগস্টে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর ভারত নানাভাবে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাকে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। তারপর বিষয়টিকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছে।

ভারতের এ আচরণ নতুন নয়। কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়। স্বাধীন ও স্বনির্ভর রাজনীতি ও অর্থনীতি গড়ে তুলতে সচেষ্ট সব প্রতিবেশীর সাথে দিল্লির একই আচরণ। প্রতিবেশী দেশে প্রকাশ্যে বা গোপনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের অভ্যাস দেশটির পুরনো। বাংলাদেশে সাড়ে ১৫ বছর ধরে একটি তাঁবেদার সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

২০১৫ সালে স্থলবেষ্টিত নেপাল নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নিলে ভারত বাধা দেয়। কাঠমান্ডু সিদ্ধান্তে অটল থাকলে সে দেশে জাতিগত উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়ে নিরাপত্তার অজুহাতে সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করে ভারত। নেপাল আপস করেনি। স¤প্রতি মালদ্বীপের প্রতি ভারতের অমানবিক আচরণ বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়। শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় হস্তক্ষেপ, পাকিস্তানের সাথে বৈরী আচরণ দেশটির মজ্জাগত।

স্থলপথে নিষেধাজ্ঞায় মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের আমদানিকারক ও ব্যবহারকারীরা; যেমন হয়েছে ভিসা নিষেধাজ্ঞায়। বাংলাদেশের মোট রফতানির মাত্র ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ যায় ভারতে। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে মোট আমদানির ১৪ শতাংশের বেশি। ভারতের শীর্ষ ১০ রফতানি গন্তব্যের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ নম্বরে। যেখানে বাংলাদেশী পণ্যের শীর্ষ ১০ গন্তব্যের মধ্যে ভারত ৯ নম্বরে।

তাৎক্ষণিক ক্ষতি হলেও ভারতের এই দাদাগিরির চেষ্টা আমাদের স্বাধীন রাজনীতি ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়তে সহায়ক হতে পারে। দরকার শুধু প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সক্ষমতা অর্জন।