দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় একটি ‘মানবিক করিডোর’ প্রসঙ্গ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে। সেখানে অবস্থানরত বিপন্ন রোহিঙ্গাদের জীবন নতুন করে হুমকিতে পড়েছে। তাদের ত্রাণসহায়তা দেয়া জরুরি। এ জন্য জাতিসঙ্ঘের ত্রাণ সংস্থা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তাব করেছে। এ প্রস্তাব নিয়ে তুমুল আলোচনার সূত্রপাত।

প্রধান রাজনৈতিক দলসহ গোটা রাজনৈতিক মহল থেকে বলা হচ্ছে, এ করিডোর দিলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। কেউ বলছেন, বাংলাদেশকে মিয়ানমারের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার ছক বাস্তবায়নে কাজ করছে; এমন কথাও তুলেছেন অনেকে। বলা হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত আসতে হবে নির্বাচিত সংসদ থেকে। অথচ এ বিষয়ে বাস্তবে কতটা কী হয়েছে সেদিকে কারো নজর নেই। তবু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে সব মহলের এ নতুন সতর্ক অবস্থান প্রশংসনীয়। কারণ গত ১৭ বছরের সেনাসমর্থিত সরকার ও পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় সার্বভৌমত্ব থাকা না থাকা নিয়ে আমরা মুখ খুলতেও পারিনি।

এখন বলা দরকার, বিশ্বের বহু যুদ্ধ-সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে বিপণ্ন মানুষের রক্ষায় জাতিসঙ্ঘ এ ধরনের করিডোর দিয়ে ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে, বিপন্ন মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি শিশুদের যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেয়া, সুদান, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায়, বর্তমান ফিলিস্তিনের গাজায় এ ধরনের করিডোরের বহু দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে আছে। সুতরাং এটি নতুন কিছু নয়। কোথাও কোথাও করিডোরে প্রতিপক্ষের হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু দেশগুলোর স্বাধীনতা বিপণ্ন হয়েছে এমন নয়। তা ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে অনেক আগেই বলা হয়েছে, কথিত ‘মানবিক করিডোর’ চালুর বিষয়ে জাতিসঙ্ঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সাথে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আলোচনা হয়নি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, জাতিসঙ্ঘ ‘করিডোরের’ উদ্যোগ নিলে সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। জাতিসঙ্ঘও বলেছে, রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠাতে দুই দেশের অনুমতি লাগবে। আমাদের ধারণা, এ বিষয়ে সব দিক বিচার-বিবেচনা করে কথা বলা কর্তব্য।

মানবিক করিডোর নিয়ে মূল যে বিষয়গুলো বিবেচ্য তার প্রথমটি হলো রাখাইনের অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা সত্যি বিপন্ন কি না। জাতিসঙ্ঘ স্বয়ং বলছে, রাখাইনের মানুষ চরম বিপদের মধ্যে আছে। ত্রাণ না পাঠালে তাদের জীবন হুমকিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নতুন করে বাংলাদেশে আসার খবর এখনো টাটকা। বাংলাদেশ সবসময় বিশ্বের যেকোনো বিপন্ন ও মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাংবিধানিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে দায় আমরা স্বীকার করে নিয়েই বলতে চাই মানবিক করিডোর দেয়া হলে বাংলাদেশের সুবিধা বা অসুবিধা কী তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

রাখাইনে আরাকান আর্মির দখল ঘিরে উদ্ভূত নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন উপেক্ষা করা যায় না। সেখানে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে ঢাকাও স্বস্তিতে থাকবে। আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হবে। না হলে, আরো রোহিঙ্গার বোঝা চাপতে পারে। কাজটি যদি আমেরিকার সহায়তায়ও হয়, বাংলাদেশের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।