আজ ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের জীবনে সব ধরনের শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে তাদের ন্যায্য ও স্বীকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পূরণের দিন। বিশে^র প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা, বিদ্যমান সব বাধা অপসারণ করে তার সুস্থ-স্বাভাবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু আমরা জানি, বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ আজও অধিকারবঞ্চিত। শুধু শ্রমিক শ্রেণী নয়, ধনী দরিদ্র সব দেশেই সব শ্রেণী-পেশার কোটি কোটি মানুষ এখনো ন্যূনতম প্রাপ্য না পেয়েই জীবন কাটিয়ে দেয়। প্রাপ্য অধিকার আদায়ের, এমনকি দাবি করার মতো অবস্থাও সবার নেই। সে ক্ষেত্রে শ্রমিকদের একটি আন্তর্জাতিক দিবস অন্তত আছে। সেটি মে দিবস। এ দিন তারা তাদের কণ্ঠ উচ্চকিত করতে পারে, দাবির পক্ষে আওয়াজ তুলতে পারে। বিশে^র মানুষও তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলে। এটি শ্রমিকদেরই অর্জন। তারা জীবন দিয়ে তাদের অধিকারের স্বীকৃতি আদায় করেছে।

দৈনিক ৮ কর্মঘণ্টার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে নিহত হন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। তাদের সেই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় ঐতিহাসিক ‘মে দিবস’। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ ৮০টি দেশে দিনটি যথাযথভাবে পালন করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে ‘শ্রম দিবস’ পালন করা হয় সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশে বিভিন্ন দিবস পালন যেভাবে আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে, তেমন অবস্থা মে দিবসেরও।

শ্রমজীবী মানুষের জন্য প্রথম দরকার কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরি। বাংলাদেশে শিল্প খাতের দ্রুত প্রসার ঘটছে। গত ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের ধারায় এ খাতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যে নামলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের আন্তরিক চেষ্টা চলছে। নির্বিঘ্নে সামনে এগুতে পারলে শিগগিরই দেশে অনেক নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা হবে। শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। এ জন্য শ্রমিকরা যাতে একটি পরিচ্ছন্ন ও উন্নততর জীবন পেতে পারেন তার নিশ্চয়তা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রম আইনসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো হালনাগাদ করার দরকার আছে।

একই সাথে কৃষি খাতের শ্রমিকদের নিয়েও ভাবতে হবে। দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক তথা চাষিরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়েও কৃষকরা প্রায়ই ন্যায্য দাম পান না। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমজীবী অন্যান্যের ওপরও। দেশের বাইরে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি বঞ্চনা সর্বজনবিদিত। বিদেশে বৈরী পরিবেশে কাজ করার পরও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। তাদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্র এখনো যথেষ্ট কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শ্রমজীবীদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রম আইনের নিরিখে নয়, আমাদের নিজস্ব ধর্মের বিধানেও শ্রমিকের কিছু অধিকার দেয়া হয়েছে যা সত্যিকারের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। এ বিষয়ে সচেতন হলে আমরা শ্রমিকদের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো কিছু করতে পারব।