বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো শক্ত ভিতে দাঁড়াতে পারেনি। এর ওপর দীর্ঘ সময় দেশপ্রেমহীন একটি গোষ্ঠী দেশ শাসন করায় স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা সব প্রতিষ্ঠান নানা মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফ্যাসিবাদী এই সরকারের লক্ষ্য ছিল শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকা ও অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন। তাই প্রকল্প প্রণয়ন করে অর্থ লুটে নেয়ার নীতি নেয়। এ কারণে জাতীয় স্বার্থ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় এটি সর্বাধিক স্পর্শকাতর ভার্চুয়াল স্থাপনার একটি। অথচ এর নিরাপত্তায় সরকার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ফলে জনগণের তথ্য খুব সহজে চুরি হয়েছে। এখনো তথ্যভাণ্ডারটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জাতীয় পরিচয়পত্রের (এআইডি) তথ্যভাণ্ডার নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ সাইবার অডিট করেছে। তাতে তথ্যভাণ্ডারের ঠুনকো নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি সামনে এসেছে। জানা যাচ্ছে, বড় কোনো বিপর্যয়ে বন্ধ হলে এটি পুনরুদ্ধারের সুযোগ নেই। এ ছাড়া ইসির তথ্যভাণ্ডারটি এখনো অরক্ষিত। তৃতীয় কোনো পক্ষ নাগরিকের তথ্য অন্যের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এ তথ্য বেহাত হয়ে নাগরিকরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ওই ভাণ্ডারে রয়েছে ১২ কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত ৪৬ ধরনের তথ্য এবং বায়োমেট্টিক ছাপ। এখান থেকে নতুন ভোটার নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন করা হয়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয় এ তথ্যভাণ্ডার থেকে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ে সম্পূর্ণরূপে এর ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের সাথে ইসির চুক্তি রয়েছে। এনআইডি নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করে এসব প্রতিষ্ঠান।
দীর্ঘ ১৮ বছরে গড়ে ওঠা একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার এটি। অথচ ইসিতে স্থাপিত ডাটাবেজে দুর্ঘটনা ঘটলে কিংবা কোনো নাশকতা হলে জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সব সেবা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এ ধরনের বড় ভার্চুয়াল সার্ভিস ব্যবস্থাপনায় আপৎকালীন বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হয়। যাকে ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম (ডিআরএস) বলা হয়। বিগত সরকারের আমলে ইভিএমসহ নানা কাজে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অপচয় করলেও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ডিআরএস প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সামনে আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন রয়েছে। বড় ধরনের বিপত্তি হলে আশঙ্কা রয়েছে তথ্যভাণ্ডার দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে করে ভোটার তালিকা প্রিন্ট করা খুব কঠিন হবে। ভোটারদের তথ্য গায়েব হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, ডাটা সংরক্ষণ সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ ইসির কাছে নেই, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। এ অবস্থায় এটি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা স্বাভাবিক।
শেখ হাসিনা সরকারের অনিয়ম দুর্নীতি-গাফিলতির কারণে তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার ৯ মাস কেটে গেলেও ডিআরএস স্থাপনে যথেষ্ট অগ্রগতি নেই, ইসির কাছে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণও আসেনি। ডাটা সংরক্ষণের হার্ডওয়ার অনেক পুরনো, এখানেও বিপত্তি ঘটতে পারে, তাই এর জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। জাতীয় তথ্যভাণ্ডারটির নিয়ন্ত্রণে একদল দক্ষ লোকবল দরকার। ইসির অধীনে এ ধরনের একটি টিম দ্রুততম সময়ে তৈরি করতে হবে।