ঢাকা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা একটি প্রাচীন নগরী। শহরটি দ্রুত বেড়ে ওঠার কারণ আশপাশের আরো কয়েকটি নদী। বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগরীর একটি। তবে নদীগুলো অযত্ন-অবহেলায় এখন প্রাণ হারাতে বসেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শহরে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীর ওপর। এখন ঢাকা ও এর আশপাশ মিলিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষের বাস। এদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে নানামাত্রিক দূষণরোধসহ নদীগুলো উদ্ধার করতে হবে।
পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিগত ১৫ বছরের বেশি সময়ে নদীখেকোদের দৌরাত্ম্য সীমাহীন বেড়ে যায়। রাজধানীর নদীগুলো সরকারের প্রভাবশালী গোষ্ঠী অনেকটা দখল করে ফেলেছে। এদের দখল ও দূষণে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা এখন মৃতপ্রায়। প্রহসনের বিষয় হলো এ সময়ে নদী উদ্ধার ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অভাব ছিল না। এগুলো ছিল এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজের পকেট ভারী করতে। দখলদার ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে তারা কখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়ন করে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
২০১৮ সালে রাজধানী ও এর আশপাশের নদী উদ্ধারে ৮৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় নদী উদ্ধারের পাশাপাশি জেটি নির্মাণ, তীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কথা ছিল। সহযোগী একটি পত্রিকার খবর, পিলার বসিয়ে নদীর জায়গা দখল এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণ না করে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। পরে যথাসময়ে কাজ শেষ করা যায়নি দেখিয়ে প্রকল্প ব্যয় আরো ৩৩২ কোটি টাকা বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিকভাবে নদী উদ্ধার ও দূষণ দূরে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আট মাসের মাথায় দেখা যাচ্ছে এসব উদ্যোগও ঝিমিয়ে পড়েছে।
লক্ষণীয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এখন শুধু পলিথিন নিষিদ্ধ নিয়ে কাজ করছে। এ সরকার যদি পলিথিন ব্যবহার সাফল্যজনকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত তা-ও একটি কাজের কাজ হতো। হাটবাজারে এখনো আগের মতো দেদার পলিথিন বিক্রি এবং ব্যবহার হচ্ছে। দুর্ভাবনার বিষয় হলো আমাদের খাদ্যচক্রে পলিথিন অনুপ্রবেশ করেছে। এটি অনাগত দিনে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। সঙ্গত কারণে অন্তর্বর্তী সরকারকে ঢাকার নদীগুলো দখল ও দূষণমুক্ত করতে কিছু কার্যকর অগ্রগতি আনতে হবে। এক্ষেত্রে বাছাই করে নদীর কিছু অংশ নেয়া যেতে পারে। সেই অংশ দখল ও দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। আশার কথা, চট্টগ্রাম নগরীতে খাল সংস্কারের এমন একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বায়ুদূষণ, মাটিদূষণ ও শব্দদূষণে ঢাকা প্রায়ই বিশ্বে প্রথম স্থানে চলে যাচ্ছে। এ কারণে ঢাকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দুস্থ শহরগুলোর একটি। নানাবিধ মানবীয় বিপর্যয়ে শহরটি বসবাসের পরিবেশ-প্রতিবেশ তীব্রভাবে প্রতিকূল। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই শহরটি মনুষ্য বসবাসের উপযোগিতা হারাবে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বল্পসময়ে অন্ততপক্ষে শহরের নদীগুলো নিয়ে একটি অনুকরণীয় সংস্কারকাজ শুরু করতে পারে। সেদিকে সংশ্লিষ্টরা মনোযোগ দিলে রাজধানীর বাস-উপযোগিতা কিছুটা হলেও বাড়বে বলে আশা করা যায়।