বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ঝড়, বন্যা, খরার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এর মধ্যে নতুন করে দেখা দিয়েছে মাত্রাতিরিক্ত বজ্রপাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বজ্রাঘাতে প্রাণহানি বেড়েছে। যদিও পুরো দক্ষিণ এশিয়াই বজ্রপাতপ্রবণ। তবে শ্রীলঙ্কা, ভারতের কয়েকটি অংশে এবং নেপালে বজ্রপাত হলেও এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা এবং মৃত্যুর হার অনেক বেশি। জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যায়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে মারা যায় বছরে গড়ে ২০ জনেরও কম।

দেশের কুমিল্লা, নোয়াখালী, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকা বিভাগ আগে বজ্রপাতপ্রবণ ছিল। এখন সারা দেশে বজ্রপাত হয়। ব্যাপক হারে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় ২০১৬ সালের ১৭ মে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবার গ্রীষ্মের শুরুতেই ইতোমধ্যে বজ্রপাতে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত সোমবার এক দিনেই ১০ জেলায় ১৯ জন মারা গেছেন।

একাধিক গবেষণার ফল বলছে, দেশ বজ্রপাতপ্রবণ হওয়ার মূল কারণ আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান। এ দেশের এক দিকে বঙ্গোপসাগর, এরপর ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরে হিমালয়ের অবস্থান, যেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। এ দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

দুর্যোগবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের মতে, বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ। বিশেষ করে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াকে বজ্রপাত বৃদ্ধি ও মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন তারা।

বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে কিছু প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ থাকলেও বজ্রপাতের বিষয়টি অনেকটা ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক। তবে আধুনিক নানা প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলায় উন্নত দেশগুলোতে বজ্রাঘাতে মানুষের মৃত্যুহার কমেছে। লক্ষণীয়, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ভেনিজুয়েলা এবং ব্রাজিলে। কিন্তু সেখানকার তুলনায় আমাদের দেশে মৃত্যুর ঘটনা বেশি। কারণ আমরা আধুনিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি।

মূলত খোলা স্থানে মানুষের কাজ করা এবং বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষজনের অসচেতনতা এর প্রধানতম কারণ। এর বেশি শিকার হন মাঠে কাজ করা কৃষক বা জেলেরা। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে খোলা জায়গায় মানুষজন কাজ করায় সেখানে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে।

উন্নত দেশগুলোয়ও একসময় বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হতো; কিন্তু এসব দেশ বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন করে মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। তবে তার আগে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে হবে।

সঙ্গত কারণে অনায়াসে এ কথা বলা যায়, বজ্রপাতে মৃত্যু কমিয়ে আনতে মানুষকে সচেতন করতে হবে; বিশেষ করে দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ব্যাপক হারে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। পাশাপাশি বজ্রনিরোধক আধুনিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন।