বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক বিকাশ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এ সময়েও দরিদ্র এবং তাদের থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণীরও রয়েছে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা। এদিকে দেশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরুলেও দেশ পরিচালনায় আমরা টেকসই পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এর মধ্যে ফ্যাসিবাদী একটি সরকার জাতির সাড়ে ১৫ বছর কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জনসংখ্যার বিপুল একটি অংশের কর্মসংস্থান নেই। দেশে বেকারের সংখ্যা ৫ শতাংশের নিচে দেখানো হলেও কার্যত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ অর্ধবেকার কিংবা ছদ্ম-বেকার।

শ্রমশক্তি জরিপের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন গত রোববার প্রকাশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরো (বিবিএস)। এতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের শেষ তিন মাসে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার। একই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার। বছরের শেষে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬ লাখ ১০ হাজার। আগের বছর ২০২৩ সালে দেশে বেকার ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। সে হিসাবে এক বছরে বেকার বেড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার। বছর অনুযাযী, ২০২৩ সালে সক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ বেকার ছিল। ২০২৪ সালে বেড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, দেশে পুরুষ বেকার ১৮ লাখ এবং নারীর সংখ্যা আট লাখ।

বিবিএসের জরিপ বলছে, দেশের ৯৫ শতাংশের বেশি সক্ষম জনশক্তি কর্মে নিয়োজিত। উন্নত বিশ্ব কিংবা মধ্যম-আয়ের দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশে উচ্চ বেকারত্ব নেই। প্রকৃত বাস্তবতায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো সামনে এলে দেখা যাবে, কর্মে নিয়োজিত থাকলেও তারা উপযুক্ত মজুরি পান না। কৃষি, শিল্প, গৃহস্থালি এবং সেবা খাতে নিযুক্ত থাকলেও তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। দেশে পোশাকশিল্পের ব্যাপক বিস্তারে এ খাতে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু তাদের উপযুক্ত বেতন নেই। আবার সময়মতো তা পরিশোধ করা হয় না। ন্যায্য মজুরির দাবিতে পোশাককর্মীদের রাস্তায় নামতে হয়। সেবা খাতে একইভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিম্নে আয়ে নিয়োজিত।

সরকারি পরিসংখ্যানে কৃষিতেও বিপুল জনশক্তি নিয়োজিত দেখানো হয়। অথচ তারা সে অনুযায়ী অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে পারেন না। সঙ্গত কারণে তাদের ছদ্ম-বেকার বলতে হবে। দেখা গেল, একটি পরিবারে মাত্র একখণ্ড জমি আছে। কর্মক্ষম সদস্য রয়েছেন পাঁচজন। পরিসংখ্যানে দেখানো হয়, সবার কর্মসংস্থান হয়েছে কৃষিতে। বাস্তবে তারা সারা বছরের খাবারের ব্যবস্থাও করতে পারেন না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নিয়ম অনুসারে, বেকার হচ্ছেন- যারা সাত দিনের মধ্যে মজুরির বিনিময়ে এক ঘণ্টা কাজের সুযোগ পাননি। সেই সাথে এক মাস ধরে কাজ খুঁজছেন, কিন্তু মজুরির বিনিময়ে কোনো কাজ পাননি। বেকারত্ব নির্ধারণে বাংলাদেশ আইএলওর এই মডেল অনুসরণ করে। তবে এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই বেকারত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড আমাদের নতুন করে ঠিক করতে হবে।