প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পুঁজিবাজার নিয়ে প্রথমবারের মতো কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। গত রোববার সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন তিনি। বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা যে পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো হলো ১. যেসব বিদেশী বা বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের মালিকানা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেয়ারবাজারে আনা; ২. বেসরকারি খাতের যেসব দেশী বড় কোম্পানি রয়েছে সেগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে পুঁজিবাজারে আনা; ৩. বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল এনে তিন মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করা; ৪. পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া এবং ৫. বড় কোম্পানিগুলো যাতে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে শেয়ারবাজারে বন্ড বা শেয়ার ছেড়ে পুঁজি সংগ্রহে আগ্রহী হয়, এমন ব্যবস্থা নেয়া। উদাহরণ হিসেবে ইউনিলিভারের প্রসঙ্গ উঠেছে। এ কোম্পানিতে সরকারের প্রায় ৪০ শতাংশ মালিকানা আছে। সে জন্য প্রণোদনা দেয়া হলে এ ধরনের কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনা সহজ হবে এবং তাতে বাজার শক্তিশালী হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুঁজিবাজার নিয়ে এটি প্রথম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। ড. ইউনূসের নির্দেশনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সহজ নয়। কারণ পতিত স্বৈরাচারের আমলেও ঢাকঢোল পিটিয়ে এমন অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল একটি গোষ্ঠীর পুঁজিপতিদের সুবিধা দেয়া। মূলত পুঁজিবাজার লুণ্ঠনকারীরা এ বাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ছিলেন। ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বারবার পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়েছে, বাজারের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা আক্ষরিক অর্থে পথে বসেছেন। এসব নিয়ে তদন্তও হয়েছে অনেক। কিন্তু দোষীদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন নজির নেই।
গত রোববারের বৈঠকের পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এবারের বৈঠকের মূল বার্তা হলো দ্রুত ও অর্থপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করা, যাতে সবার উপকার হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে ন্যূনতম শৃঙ্খলা দৃশ্যমান নয়। কিছুই সুষ্ঠুভাবে কাজ করছে না। তারল্যপ্রবাহে ভাটার টান চলছে, মূল্যসূচক টানা অধোগামী হচ্ছে, নতুন কোনো কোম্পানিও এ বাজারমুখো হচ্ছে না। এমনকি দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে যে দাফতরিক পরিবেশ দরকার তা-ও অনুপস্থিত। এক কথায় পুঁজিবাজারের প্রতি সবার গভীর অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
মাসখানেক আগে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একজন নির্বাহী পরিচালকের বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে হেনস্তা হন সংস্থার চেয়ারম্যান। এ ঘটনায় ২১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কমিশনের কার্যক্রম এখনো সুষ্ঠুভাবে চলছে এমন বলা যাবে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সব কিছুর জন্য দায়ী বিএসইসির দুর্বল নেতৃত্ব। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সংস্থার প্রধানকে বিদায় করা হচ্ছে এমন খবরে সূচক বেড়ে যায়। এসব ঘটনায় এটি স্পষ্ট, শৃঙ্খলা ফেরাতে সবার আগে দরকার সবল নেতৃত্ব। সেই সাথে দেশের অর্থনীতিসহ জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক সংস্কার জরুরি। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন পুঁজিবাজারে গতি সঞ্চার করবে বলে আমরা আশাবাদী।