শুল্ক-কর প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কার করা হলো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে আলাদা দু’টি বিভাগ তৈরি হচ্ছে। রাজস্ব নীতি বিভাগ থাকবে শুল্ক-কর হার নির্ধারণের দায়িত্বে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আদায় করবে শুল্ক-কর। অনেক দিন থেকেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে এই পরামর্শ দিয়ে আসছিল। বিশ্বের সব দেশেই রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আলাদা বিভাগ আছে।

বলা যায়, নতুন এই সংস্কার মূলত আইএমএফের সুপারিশ বা শর্তেরই বাস্তবায়ন। অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফের মুদ্রার বিনিময় হারসংক্রান্ত শর্তও মেনে নিয়ে ঋণের কিস্তি পাওয়া নিশ্চিত করেছে। পতিত সরকার দেশের অর্থনীতি যে নাজুক অবস্থায় ফেলে গেছে সেখানে আইএমএফের ঋণ পাওয়া জরুরি। রাতারাতি সব ঠিক করে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

তবে এনবিআর বিলুপ্তকরণ নিয়ে এই সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এর প্রতিবাদ করছেন। কলমবিরতির মতো কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। এটি ঘটছে দু’টি কারণে। প্রথমত দীর্ঘ ৫৪ বছরের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের আবেগ-অনুভূতি জড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়ত কর প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থহানির আশঙ্কা করছেন। তারা মনে করছেন, এই সংস্কারের ফলে রাজস্ব খাতে প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বাড়বে। সীমিত হতে পারে শুল্ক-কর কর্মকর্তাদের সুযোগ।

আবেগ-অনুভূতির বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা জাতীয় স্বার্থের ওপরে নয়। এনবিআর মাত্র ৫৪ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান। আমাদের এই ভূখণ্ডে দেড় শ’ বছরেরও বেশি পুরনো জমিদারি প্রথাও বিলুপ্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে মহাপরাক্রমশালী জমিদারদের চেয়ে প্রজাসাধারণের স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এনবিআর বিলুপ্ত করা হলেও কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, এনবিআরের বিদ্যমান জনবল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ন্যস্ত হবে। তবে এদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় জনবল রাজস্ব নীতি বিভাগেও পদায়ন করা যাবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশাসনিক পদে প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তারাও নিয়োগ পাবেন।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করেই এটি করা হয়েছে। আরো কিছু করণীয় থাকলে তা বিবেচনার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। লক্ষণীয়, কর কর্মকর্তাদের নিজস্ব সমিতি এই পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি তোলেনি।

অর্থনীতিবিদদের অনেকে এটিকে সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এই সংস্কারের ফলে কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ হবে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘ দিন ধরে এ ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিলেন। একই সংস্থার কাছে নীতি প্রণয়ন ও আদায়ের দায়িত্ব থাকায় কর ব্যবস্থপনায় জটিলতা ছিল। ব্যবসায়ী ও করদাতাদের হয়রানির অভিযোগ ছিল।