‘সঠিক পরিস্থিতিতে’ সিরিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সম্প্রতি রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ও ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ কোরি মিলস সাথে এক বৈঠকে এই কথা বলেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। এ সময় আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিতে প্রস্তুত বলেও আগ্রহ প্রকাশ করেন শারা। একইসাথে তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আহ্বান জানান এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ায় ইসরাইলি দখলদারিত্ব মোকাবেলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শারা-মিলস বৈঠকের বার্তা
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ কোরি মিলস সিরিয়ায় এক তথ্য-অনুসন্ধান মিশনে যান। এ সময় তিনি দামেস্কে প্রেসিডেন্ট শারা’র সাথে ৯০ মিনিটের এক বৈঠক করেন। এ বিষয়ে মিলস ব্লুমবার্গকে বলেন, তিনি শারার সাথে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সম্ভাবনা, রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস এবং সন্ত্রাসবাদ দমন সংক্রান্ত আলোচনা করেন।
মিলস জানান, তিনি শারাকে বলেন, সিরিয়াকে অবশ্যই বাশার আল-আসাদের রেখে যাওয়া রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করতে হবে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে উগ্রবাদবিরোধী সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে এবং এইচটিএস-এর মতো গোষ্ঠীর সাথে জড়িত বিদেশী যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে হবে।
এ সময় তিনি শারাকে ইসরাইলকে নিশ্চয়তা দেয়ার উপরও তাগিদ দেন।
ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও সিরিয়ার সঙ্কট
আসাদের পতনের পর থেকে সিরিয়া একাধিকবার ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশে দেশটির সেনারা দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার অংশে প্রবেশ করেছে। এখন জাতিসঙ্ঘ বাফার জোনসহ কিছু এলাকায় ইসরাইলি সেনার উপস্থিতি রয়েছে।
সিরিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। নাগরিকদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। গৃহযুদ্ধে ক্ষয়-ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ ৪০০ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ সালের গণবিক্ষোভে আসাদের দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
আঞ্চলিক সমর্থনের খোঁজে শারা প্রশাসন
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা উপসাগরীয় ও তুরস্কীয় বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে। অথচ এসব দেশই সিরিয়ার পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে।
মার্চে মার্কিন প্রশাসন কাতারকে জর্ডানের পাইপলাইন দিয়ে সিরিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠানোর অনুমতি দেয়। পাশাপাশি সৌদি আরব বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে সিরিয়ার ঋণ পরিশোধে সহায়তা করছে, যা পুনর্গঠনের প্রাথমিক তহবিল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
‘সৈনিক থেকে সৈনিক’ সংলাপ
শারা একটি ব্যক্তিগত চিঠির মাধ্যমে ট্রাম্পের সাথে যোগাযোগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় শারা আল-কায়েদায় যোগ দিয়েছিলেন। মিলস নিজেও ওই সময় একজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। মিলস বলেন, ‘আমি ওর সাথে সৈনিক থেকে সৈনিকের মতো করে কথা বলতে চেয়েছি।’
আব্রাহাম চুক্তি ও আরব বিশ্ব
শারার বক্তব্য তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মরক্কোর মতো আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। তবে এই রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরাইলের কখনো সরাসরি যুদ্ধ হয়নি। শারা নিজেই গোলান হাইটসের বাসিন্দা, যেটি ১৯৬৭ সালে ইসরাইল দখল করে।
ফিলিস্তিনি দমন ও মার্কিন বার্তা
ক্ষমতায় আসার পর শারা ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের উপর দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি দামেস্ক ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের দুই সিনিয়র কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সিরিয়ার একটি কৌশলগত বার্তা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এক মার্কিন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘নতুন শাসকদের দায়িত্ব হলো আমেরিকার প্রত্যাহারের সময় মার্কিন ও ইসরাইলি নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলার সক্ষমতা দেখানো।’
তুর্কি-সিরিয়া চুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বর্তমানে শারা সরকার তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ।
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, তুরস্ক ও ইসরাইল এই ইস্যুতে সঙ্ঘাত নিরসন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করছে।
এদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্য সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। এটি নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই পথে না এলে এসব উদ্যোগের প্রভাব সীমিতই থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই