বিশ্বজুড়ে বাজার ধসে পড়ার পরেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শুল্ক পরিকল্পনা দ্বিগুণ করেছেন। শনিবার ট্রাম্পের প্রধান মিত্র ইলন মাস্কের সাথে বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারোর প্রকাশ্য দ্বন্দের পর ট্রাম্পের সহযোগীদের মধ্যে বিভক্তির লক্ষণ দেখা দিয়েছে। অন্যরা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যও উপস্থাপন করেছেন।

মাস্ক ও নাভারোর মধ্যে কী হয়েছিল?

বুধবার ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এটি কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন বাণিজ্য নীতিতে একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়। পদক্ষেপটি অর্থনীতিবিদ ও ট্রাম্পের শুল্ক আরোপিত দেশগুলোর মধ্যে সমালোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রধান স্টক সূচক- ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও নাসডাক গত সপ্তাহে পাঁচ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এটি ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টক মার্কেটের সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং প্রশাসনের বাণিজ্য ও উৎপাদন-বিষয়ক সিনিয়র পরামর্শদাতা পিটার নাভারো বৃহস্পতিবার মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের সাথে এক সাক্ষাৎকারে শুল্ক আরোপের পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি বলেন, ‘মার্কেট তলানিতে পৌঁছবে। খুব শীঘ্রই তা হবে এবং সেখান থেকে আমাদের একটি তেজি উত্থান ঘটবে। ট্রাম্পের মেয়াদে ডাও ৫০ হাজারে পৌঁছাবে।’ সোমবার পর্যন্ত লেনদেন শুরু হওয়ার আগে ডাও জোন্স ৩৮ হাজার ৩১৪-তে ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের একজন ব্যবহারকারী সিএনএনের সাথে নাভারোর সাক্ষাৎকারের একটি ক্লিপ পোস্ট ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপদেষ্টার ডক্টরেট ডিগ্রির দিকে ইঙ্গিত করার পর মাস্ক তার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্মটিতে পাল্টা জবাব দেন।

মাস্ক পোস্ট করেন, ‘হার্ভার্ড থেকে ইকোনমিতে পিএইচডি করা খারাপ জিনিস, ভালো জিনিস নয়।’

নতুন শুল্কের প্রথম ধাপে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবসহ দেশগুলোর ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প যে উচ্চতর শুল্ককে পাল্টা শুল্ক বলে অভিহিত করছেন, তা বুধবার থেকে চীন, ভারতসহ অন্যান্য দেশগুলোর ওপর কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

ইউরোপের ওপর শুল্কারোপ সম্পর্কে মাস্ক কী বলেছেন?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নাভারোর বিরুদ্ধে আঘাতই শুল্ক আরোপের বিষয়ে মাস্কের একমাত্র মন্তব্য নয়। শনিবার মাস্ক ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অতি-ডানপন্থী দলের নেতা মাত্তেও সালভিনির সাথে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে কথোপকথনে যোগ দেন। মাস্ক সরকারি ব্যয় হ্রাস করার জন্য ট্রাম্পের নতুন দফতর ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডিওজিই) তত্ত্বাবধান করেন।

মাস্ক এই কথোপকথনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ‘শূন্য-শুল্ক পরিস্থিতি’ নিয়ে আশা প্রকাশ করেন। যদিও ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই আদর্শভাবে শূন্য-শুল্ক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। কার্যকরভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করা উচিত।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মাস্ক স্পেসএক্স ও টেসলার সিইও এবং উভয় প্রতিষ্ঠানেরই বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তার প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। ইউরোপীয় অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের ২৫ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, শুধুমাত্র ইউরোপেই ২০২৪ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে টেসলার বিক্রয় ৪৯ শতাংশ কমেছে। টেসলার শেয়ারের দামও কমেছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

নাভারোর প্রতিক্রিয়া কী?

নাভারো রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপে শুল্ক সম্পর্কে মাস্কের মন্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘ইলন মাস্কের ইউরোপের সাথে শূন্য-শুল্ক অঞ্চল সম্পর্কে বলা কথাগুলো আকর্ষণীয় ছিল। তবে তিনি তা বোঝেন না।’

নাভারো বলেন, ‘আমি মনে করি ইলনের যে বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো তিনি গাড়ি বিক্রি করেন। তিনি এটাই করেন।’ তিনি ইঙ্গিত দেন, শুল্ক সম্পর্কে মাস্কের মন্তব্য তার ব্যবসায়িক স্বার্থের সাথে যুক্ত ছিল।

শুল্ক সম্পর্কে মাস্ক আগে কী বলেছিলেন?

গত মাসে টেসলা মার্কিন সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিল, ট্রাম্পের শুল্ক লক্ষ্যমাত্রা মার্কিন পণ্যের ওপর তাদের নিজস্ব শুল্ক আরোপ করলে সেই শুল্ক বৈদ্যুতিক যানবাহন কোম্পানিগুলোর ক্ষতি করতে পারে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারকে লেখা একটি স্বাক্ষরবিহীন চিঠিতে টেসলা বলেছে, ‘অন্যান্য দেশ যখন মার্কিন বাণিজ্য পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া জানাবে তখন মার্কিন রফতানিকারকরা সহজাতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাবের মুখোমুখি হবেন।’

কোম্পানিটি আরো বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অতীত বাণিজ্য পদক্ষেপের ফলে লক্ষ্যবস্তুভুক্ত দেশগুলো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সেই দেশগুলোতে আমদানি করা বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি।’ এর আগে, ২৬ মার্চ ট্রাম্প গাড়ি আমদানি ও নির্দিষ্ট কিছু অটোমোবাইল যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।

এর জবাবে মাস্ক এক্সে লিখেছেন, ‘এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে টেসলার ওপরও আঁচ পড়েছে। টেসলার ওপর শুল্কের প্রভাব উল্লেখযোগ্য।’

ট্রাম্প টিমের মধ্যে কি অন্য কোনো বিভক্তির লক্ষণ আছে?

বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক রোববার মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজকে বলেছেন, ১০ শতাংশ বেসলাইন শুল্ক ’সপ্তাহের জন্য বহাল থাকবে’ এবং উচ্চতর পারস্পরিক শুল্কও কার্যকর হবে।

তবে একইদিনে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এনবিসির মিট দ্য প্রেসকে বলেন, ৫০টিরও বেশি দেশ শুল্ক কমাতে আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ করেছে। মার্কেট পতনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘মার্কেট ধারাবাহিকভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবমূল্যায়ন করে।’

রোববারেই সিএনএন উপস্থাপক জ্যাক ট্যাপার কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রোলিন্সকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ট্রাম্প ও লুটনিকের কথামতো শুল্ক কি এখানেই থাকবে? রোলিন্স সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দেননি।

সূত্র : আল জাজিরা