মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে ’অর্থনৈতিক স্বাধীনতা’ দিতেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে বাণিজ্যযুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। এর ধাক্কা সামলাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে যে সব পণ্য কিনে থাকে, সেসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে দেশগুলো। ফলে পোশাক থেকে শুরু করে কফি- সব কিছুর জন্যই অতিরিক্ত দাম গুণতে হবে মার্কিনদের।
বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পর ট্রাম্প বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছেন। তিনি যেসব দেশকে ’সবচেয়ে বেশি অপরাধী’ বলে মনে করেন তাদের জন্য এই হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আজ (৫ এপ্রিল) থেকে এগুলো কার্যকর হতে শুরু করবে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন নতুন শুল্ক এবং অন্যান্য দেশগুলো প্রতিশোধ হিসেবে যে শুল্ক আরোপ করবে তা মার্কিনদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল বলেছেন, এটি মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি করবে।
কারণ পণ্য আমদানিকারী কোম্পানিগুলো শুল্কের খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে অথবা কেবল দেশে কম পণ্য আনতে পারে। ফলে সীমিত সরবরাহ তৈরি হতে পারে।
পোশাক
ট্রাম্পের ’সবচেয়ে বেশি অপরাধীদের’ তালিকায় রয়েছে ভিয়েতনাম, চীন ও বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদন কেন্দ্রগুলো। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পাঁচটি বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারকের মধ্যে এই তিনটি দেশের পণ্যের ওপর শিগগির ৩৪ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হবে।
ফলে টার্গেট ও ওয়ালমার্টের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোসহ পোশাক খাতের পরিচিত আরো কিছু ব্র্যান্ড আর্থিক চাপ অনুভব করতে পারে। এসব স্টোর থেকে মার্কিন ভোক্তারা সুলভ মূল্যে পোশাক কিনে থাকেন।
ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ও পোশাক অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক শেং লুয়ের বিশ্লেষণ অনুসারে, মার্কিন পোশাক খুচরা বিক্রেতা গ্যাপের প্রায় ২১ শতাংশ পোশাক ভিয়েতনাম থেকে আসে। আরো ৩৭ শতাংশ পোশাক আসে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ থেকে। গ্যাপ ওল্ড নেভি, ব্যানানা রিপাবলিক ও অ্যাথলেটাও পরিচালনা করে।
সুলভ মূল্যে ফ্যাশনেবল পোশাকের জন্য পরিচিত এইচএন্ডএম চীন ও বাংলাদেশে তাদের অধিকাংশ পোশাক তৈরি করে।
বুধবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করে বলেছে, ’এই শুল্ক মার্কিন পরিবারগুলোর ওপর, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর অযৌক্তিক বোঝা চাপিয়ে দেবে।’
কফি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সব কফিই দেশের বাইরে থেকে আসে, যার অর্থ সকালের কাপ, তা বাড়িতে তৈরি করা হোক বা প্রিয় দোকানে, শীঘ্রই আমেরিকানদের পকেটের উপর একটি বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা নিত্যদিন যে কফি পান করেন, তার অধিকাংশই আসে দেশের বাইরে থেকে। তাই বাসাবাড়ি হোক বা দোকান- কফি পান করতে গেলে এখন থেকে তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র মূলত ব্রাজিল ও কলম্বিয়া থেকে কফি আমদানি করে। এ দুটি দেশই বেসলাইন ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়েছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে নির্দিষ্ট কিছু কফির রফতানিকারক দেশের একটি ভিয়েতনাম।
সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক কফি রোস্টারি গ্রাফিওর মালিক ওয়াল্টার হাস ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, যেদিন শুল্ক কার্যকর হবে তার পরদিন থেকেই তার প্রতিষ্ঠানকে এর ধাক্কা সামলাতে হবে। যদি শুল্ক বহাল থাকে তাহলে কফির দাম বাড়বে এবং ভোক্তাদের তা পরিশোধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য আমদানি করা খাদ্যসামগ্রীরও একই পরিণতি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে আসা খাদ্যসামগ্রীর ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ইতালি, স্পেন ও গ্রিস থেকে আমদানি করা জলপাই তেলের মতো প্রধান পণ্যের দামও আরো বাড়তে পারে।
জুতা - অ্যাডিডাস থেকে নাইকি
সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার একটি যা আমেরিকানদের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদার একটি এবং সবচেয়ে বড় ব্যয়বহুল পণ্যগুলির মধ্যে একটি, আরও ব্যয়বহুল হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে প্রিয় স্নিকার্স নাইকি এয়ার ফোর্স 1s এবং অ্যাডিডাস সাম্বাস। উভয় স্পোর্টসওয়্যার কোম্পানিই তাদের মজুদের জন্য এশিয়ান কারখানা কেন্দ্রগুলির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে, যেখানে নাইকির প্রায় অর্ধেক জুতা এবং অ্যাডিডাসের 39% জুতা ভিয়েতনামে তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিত্যদিনের ব্যবহার্য পণ্য জুতা। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস থেকে শুরু করে নাইকির জুতা কিনতে সামনের দিনগুলোতে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠান দুটি তাদের পণ্যের জন্য এশিয়ার দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। নাইকির জুতার প্রায় অর্ধেক এবং অ্যাডিডাসের ৩৯ শতাংশ জুতা তৈরি হয় ভিয়েতনামে।
অধ্যাপক লুয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ২৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের জুতা আমদানি করেছিল। এর বেশিভাগই চীন ও ভিয়েতনাম থেকে এসেছে। এ পণ্যের ওপর এতদিন শুল্ক ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এখন সেই করের পরিমাণ প্রায় তিনগুণ হতে পারে।
অ্যালকোহল, ইউরোপীয় ওয়াইন ও বিয়ার
যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াইনের বৃহত্তম বিদেশী সরবরাহকারীদের মধ্যে অন্যতম দেশ ফ্রান্স। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করায় ওয়াইন আমদানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।
ফরাসি অঞ্চল বার্গান্ডির উৎপাদকদের প্রতিনিধিত্বকারী বোর্গোগন ওয়াইন বোর্ড বলেছে, মার্কিন শুল্ক রফতানিকারক ও মার্কিন ভোক্তা উভয়ের জন্যই এটি ’একটি গুরুতর আঘাত’ বয়ে আনবে।
রেস্তোরাঁগুলোতে দাম বৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, বিশেষ করে আমদানি করা বিয়ার অথবা বিদেশী স্পিরিট ব্যবহার করা পানীয়ের ক্ষেত্রে। আলাদাভাবে ট্রাম্প সব ধরনের ক্যানড বিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অ্যালুমিনিয়ামের শুল্কও বৃদ্ধি করেছেন।
আইফোন ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য
সেল ফোন, টিভি ও ভিডিও গেম কনসোলগুলোসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ইলেকট্রনিক্সের শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
প্রায় সব আইফোনই চীনে তৈরি, তবে এর কিছু ভারতেও তৈরি হয়। ভারতও ২৬ শতাংশ শুল্কসহ ‘সবচেয়ে বেশি অপরাধীদের’ তালিকায় রয়েছে। এদিকে স্যামসাং ভিয়েতনামে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এই প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নতুন শুল্কের প্রতি কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু জাপানি ভিডিও গেমিং কোম্পানি নিনটেন্ডো শুক্রবার ঘোষণা করেছে, তারা তাদের সুইচ-২ কনসোলের প্রি-অর্ডার বিলম্বিত করছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের ’শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করা’ প্রয়োজন।
সূত্র : বিবিসি