বিশ্ব অর্থনীতি যখন নানা অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হচ্ছে তখন নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে। হুমকি, পাল্টা হুমকিসহ একের পর এক শুল্ক আরোপে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। এই উদ্বেগের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা।
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক মুক্তি দিবসে’ শুল্ক আরোপের ফলে চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন রফতানির ওপর উচ্চতর শুল্ক আরোপ করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা অন্যান্য সব দেশের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ আরোপ করে। ফলে বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারে দেখা দেয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যায়।
সোমবার ট্রাম্প চীনের সাথে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেন। সোমবার ট্রাম্প তার মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক বার্তায় হুমকি দিয়েছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে বেইজিং যদি তার সর্বশেষ শুল্ক প্রত্যাহার না করে তবে চীনের উপর আরো শুল্ক আরোপ করা হবে।
তিনি বলেন, ‘যদি চীন ৮ এপ্রিল তাদের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য অপব্যবহারের ওপর ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি প্রত্যাহার না করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকরভাবে চীনের ওপর ৫০% অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে।’
চীন কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে?
এদিকে চীনও এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, তারা পিছু হটবে না। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক যুদ্ধাত্মক অবস্থান নিয়েছে এবং বলেছে, ওয়াশিংটনের পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
চীন তাদের আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, এর লক্ষ্য ছিল তাদের ‘সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থ’ রক্ষা করা, পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাজার বজায় রাখা। দেশটি আরো জানিয়েছে, ট্রাম্প যদি আরো বেশি শুল্ক আরোপ করেন তবে তারা ‘শেষ পর্যন্ত লড়াই’ করতে প্রস্তুত।
এর পটভূমি কী?
গত বুধবার ট্রাম্প প্রায় সব মার্কিন বাণিজ্য অংশীদারের ওপর শুল্ক ঘোষণা করেন। ফলে বিশ্ববাজার অস্থির হয়ে উঠে। কিছু বিশ্লেষক এটিকে ’সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির চেয়েও খারাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে সব আমদানির জন্য বেসলাইন ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন। তিনি আরো কয়েক ডজন অন্যান্য দেশের ওপর অনেক বেশি শুল্ক ঘোষণা করেন। তার দাবি, মার্কিন পণ্যগুলোতে ওই দেশগুলো অন্যায়ভাবে কর আরোপ করেছে। তাদের তিনি ‘সবচেয়ে খারাপ অপরাধী’ বলে অভিহিত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ছোট দেশ লেসোথোর উপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে।
চীনের ক্ষেত্রেও এই কঠোরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন বছরে ৪৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আমদানি করে এবং এর ওপরেই আরোপিত হয়েছে ৩৪ শতাংশ শুল্ক। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ইতোমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন দুই দফায় চীনা পণ্যে ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করেছে। এর পর গত সপ্তাহের ঘোষণা যুক্ত হয়ে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে। যদি সোমবারের হুমকি কার্যকর হয়, তবে সেটি দ্বিগুণ হয়ে ১০৪ শতাংশে পৌঁছাবে।
চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন পণ্যে ৩৪ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। এর ফলে চীনের আরোপিত মোট শুল্ক ৪৪ থেকে ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চীন একইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত বিরল মাটির উপাদানের রপ্তানি সীমিত করেছে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরবরাহ বন্ধ করেছে।
দুই দেশের অর্থনীতির অবস্থা কেমন হতে পারে?
বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যেই দুই দেশের অর্থনীতিতে দেখা দিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় রফতানি বাজার, বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও যানবাহনের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে চীন কৃষিপণ্য, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও বিমান যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে থাকে। মরগান স্ট্যানলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সংঘাতের কারণে ২০২৫ সালে চীনের অর্থনীতি ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত দুর্বল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা করছে, চীন পরবর্তী প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন কৃষিপণ্যের আমদানি বন্ধ করতে পারে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের রফতানি আরো কমিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। সোমবার শেয়ারবাজারে ধস নামে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ০.২ শতাংশ কমেছে, ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ০.৯ শতাংশ কমেছে, যদিও নাসডাকের ০.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো গুজব অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট নাকি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি শুল্ক স্থগিত করার কথা বিবেচনা করছেন। তবে হোয়াইট হাউস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এক বার্তায় এটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়।
ট্রাম্প নিজেও এই সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তিনি এক্সে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই বিদ্যমান শুল্কের ওপর অপব্যবহারকারী দেশগুলো থেকে প্রতি সপ্তাহে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আনছে। সবচেয়ে বড় অপব্যবহারকারী চীন, যার বাজার ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। সে এখনো শুল্ক বৃদ্ধি করে অন্য দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করার বার্তা দিচ্ছে।’
সূত্র : আল জাজিরা