দেশে বিগত ১০ বছরে ফল উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট ফল উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন। সেটি বেড়ে বর্তমানে ১ কোটি ৫০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে মানুষের ফল খাওয়ার হারও বেড়েছে। ১০ বছর আগে একজন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষ দিনে গড়ে ৩৫-৪০ গ্রাম করে ফল খেত, এখন এ হার ৮৬ গ্রাম।

বিগত কয়েক বছরে দেশে বিদেশী ফল উৎপাদনও ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ড্রাগন চাষে বড় সাফল্য এসেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ড্রাগন উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৭৭ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৮১৩ টনে। ড্রাগনের পাশাপাশি এভোকাডো, আরবি খেজুর, রাম্বুটান, পার্সিমন চাষও বৃদ্ধি পেয়েছে।

আগে একটি সময়েই শুধু ফল পাওয়া যেত। এখন প্রায় সারাবছরই ফল পাওয়া যায়। উৎপাদন বাড়ায় দেশে ফল আমদানির হারও কমেছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) রাজধানীর খামারবাড়ির মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের (তৃতীয় সংশোধনী) জাতীয় কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে।

এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিসচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিম।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে আমের উৎপাদন ছিল ২০ লাখ ২৩ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্যানুযায়ী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৮ হাজার টনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, একটা সময় বিদেশ থেকে আম আমদানি হতো। অথচ গত কয়েক বছর ধরে উল্টো বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩৮টি দেশে আম রফতানি হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২১ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ হাজার ১০০ টন, তার আগের বছর ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রফতানি হয়েছে। চলতি বছর নতুন করে যুক্ত হয়েছে চীন। প্রায় ৫ হাজার টন আম রফতানির লক্ষ্য রয়েছে এবছর।

কর্মশালায় প্রকল্পের সফলতা তুলে ধরে জানানো হয়, দেশে পেয়ারা উৎপাদনও বেড়েছে। ১০ বছর আগে উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ১৩ হাজার টন; সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৩ হাজার টনে। আগে শুধু বর্ষা মৌসুমে পেয়ারা পাওয়া যেত। এখন প্রায় সারাবছরই পাওয়া যায়। দেশে উৎপাদিত পেয়ারার ৭০ শতাংশই থাই জাতের। এক সময় অতিথিদের পাতে আপেল জাতীয় ফলই শুধু দেখা হতো। এখন আপেলের পরিবর্তে দেখা মেলে বলসুন্দরী কুল/বরই। ১০ বছরে কুল/বরই উৎপাদন ১ লাখ ৬১ হাজার টন থেকে ১ লাখ ৭৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। ফলে আপেল আমদানি কমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যখন প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ টন আপেল আমদানি হয়েছে, বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে ১৭০ টনে। দেশে ক্রমাগত অন্যান্য ফল আমদানিও হ্রাস পাচ্ছে।

সম্প্রতি দেশে সাড়া ফেলেছে বারোমাসি আঠাবিহীন কাঁঠাল চাষ। বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশে ১ লাখ বারোমাসি কাঁঠাল চারা রোপণ করা হয়েছে। বর্তমান এই কাঁঠাল বিদেশে রফতানির সুযোগও সৃষ্টি করেছে। একসময় বিদেশী ফল ড্রাগন ছিল আমদানিনির্ভর। এখন দেশী ফলের মতোই ১০০-১৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকল্পের সহযোগিতায় চাষাবাদ করছেন খাগড়চড়ির নাড়িয়াচরের চাষি কবিতা চাকমা। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ৩ হাজার এমডি টু জাতের আনারস চাষ করেছেন। একটা আনারস ২ কেজি ৮০০ গ্রামের ওজন হয়েছিল। দাম ভাল পেয়েছেন, প্রতিটি আনারস ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, ‘দেশে ফলের কোনো গবেষক নেই। অথচ চাষিরা নিজেরা চাষ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা অফিসাররা তাদের কাছে শিখছি।’

তিনি বলেন, ‘মাটিতে চারা করলে বিদেশে রফতানি করা যায় না। করতে হবে কোকোপিটে। আমরা ম্যানেজমেন্ট করতে পারছি না।’

রফতানিযোগ্য আম প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘কৃষকরাই সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী। তারা নিজেরাই অনেক প্রযুক্তি বা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। আমরা যদি কোনো একটি উইংয়ের মাধ্যমে এসব প্রযুক্তিকে সংগ্রহ করে সেগুলোকে সংরক্ষণ করতে পারি এবং বার্ষিক রিপোর্ট করতে পারি সেটা কৃষিখাতে পরিবর্তন আনবে।’

বাংলাদেশে আম্রপালি আমের জনক ডিএইর সাবেক মহাপরিচালক এম এনামুল হক বলেন, ‘আমি ফল ও লেবু জাতীয় ফসল উৎপাদনে বেশি আগ্রহী ছিলাম। সে দৃষ্টিকোণ থেকেই আম্রপালি এনে দেশে আবাদের ব্যবস্থা করেছি।’

প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিম বলেন, ‘দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ৭৫০ লাখ হেক্টর ও উপকূলে ১৮ লাখ হেক্টর জমি পতিত পড়ে আছে। এসব জমিকে ফল চাষের আওতায় নিয়ে আসাই ছিল আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

তিনি বলেন, ‘১৪টি হর্টিকারচার সেন্টার করার লক্ষ্য নিয়ে ৯টি করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার ৫০০ নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তারা উদ্যোক্তা, সাবলম্বী হচ্ছে। তাছাড়া এখন পর্যন্ত ৯ হাজার বাণিজ্যিক ফল বাগান তৈরি করা হয়েছে। দেশের হর্টিকারচার সেন্টারগুলোতে আগে যেখানে দেড় কোটি চারা হতো সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে ৫ কোটি চারা উৎপাদন হচ্ছে।’

কর্মশালায় কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘এ প্রকল্পটি বন্ধ করা যাবে না। এটি চালিয়ে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রফতানির জন্য প্রযুক্তি বাড়ানোর কথা বলছি অথচ আভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা দেখছি না।’

কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে কৃষিসচিব বলেন, ‘কৃষিখাতে পদোন্নতি ও বদলিসহ সকল ধরনের কাজে সচ্ছতা ও যোগ্যতার আলোকে হতে হবে। কোনো ব্যক্তি এসব খাতে কানাকড়ি দুর্নীতি করলেও তার জীবন ডাউন করে দেয়া হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী পোস্টিং হবে।’ যারা অনিয়মের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে তাদেরকে ভালো জায়গায় পোস্টিং দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ডিএই’র মহাপরিচালক মো: ছাইফুল আলমের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: মাহবুবুল হক পাটোওয়ারী, মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. বেগম সামিয়া সুলতানা, ডিএই’র পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো: হাবিবউল্লাহ, হর্টিকালচার উইংয়ের পরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দীন প্রমুখ।