রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) নতুন সংযোজিত দু’টি জাহাজ পরিচালনা করে অল্প সময়েই প্রায় ৫০ কোটি টাকা আয় করেছে। ভবিষ্যতে বিএসসি’তে জাহাজের বহর সম্প্রসারণে নতুন চারটি জাহাজ ক্রয় করতে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে বিএসসি’র সাতটি জাহাজ আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করছে। বিএসসি ভবিষ্যতে যে চারটি জাহাজ ক্রয় করতে যাচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে দু’টি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কার ও দু’টি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ।
বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে চট্টগ্রামে বিএসসি’র সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক এ তথ্য জানান।
তিনি আরো বলেন, বিএসসি’র বহরের বর্তমানের সর্বমোট সাতটি জাহাজ রয়েছে। বাংলাদেশের পতাকাবাহী এ জাহাজগুলো বিশ্বব্যাপী চলাচল করছে।
কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, জাহাজগুলো লোকাল এরিয়ার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচালিত হয়ে সফলভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে যাত্রা সম্পন্ন করেছে।
তিনি আরো বলেন, এ জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদণ্ডে উত্তীর্ণ, যা তাদের নিরাপদ ও দক্ষ অপারেশন নিশ্চিত করে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার কারণে বিশ্ববিখ্যাত জাহাজ পরিচালনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিএসসি’র জাহাজ পরিচালনা ও ভাড়া নিতে আগ্রহী।
বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘এমভি বাংলার প্রগতি’ ও ‘এমটি বাংলার নবযাত্রা’ নামের জাহাজ দু’টি যথাক্রমে গত বছরের ২৩ অক্টোবর ও চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি চীনের জিংজিয়াং নানইয়াং শিপবিল্ডিং কোম্পানি থেকে গ্রহণ করা হয়। ক্রেতার পক্ষে বিএসসি ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা শিপইয়ার্ডে উপস্থিত থেকে জাহাজ দু’টি বুঝে নেন।
কমডোর মাহমুদুল মালেক আরো বলেন, প্রতিটি জাহাজের মূল্য ৩৮ দশমিক ৩৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, দু’টি মিলিয়ে মোট ৭৬ দশমিক ৬৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় চার দশমিক ৬০ শতাংশ কম।
তিনি বলেন, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গেল বছরের ১০ আগস্টে অনুমোদন দেয়া হয় এবং ২১ সেপ্টেম্বর বিএসসি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি’র মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি জুন ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, জাহাজ দু’টি ‘গ্রিন শিপ কনসেপ্ট’-এ নির্মিত। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, আইএমও টিয়ার-৩ মানসম্পন্ন ইঞ্জিন, নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন নিয়ন্ত্রণে এসসিআর প্রযুক্তি, কনট্রা রোটেটিং প্রপেলার, আধুনিক হাল ডিজাইন ও অ্যারোডাইনামিক ব্রিজ ব্যবহৃত হয়েছে।
এ সব প্রযুক্তির ফলে জ্বালানি খরচ কমার পাশাপাশি অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে জাহাজ দু’টি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে ‘বাংলার প্রগতি’ পোল্যান্ডের গদানস্ক বন্দরে ও ‘বাংলার নবযাত্রা’ সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে এবং এই দু’টি জাহাজ দৈনিক গড়ে ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা ২৫ লাখ টাকা ভাড়ায় নিয়োজিত রয়েছে।
বিএসসি’র বহরে সংযোজনের পর এ দুই জাহাজ থেকে আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, বহর সম্প্রসারণে বিএসসি একাধিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে দু’টি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কার ও দু’টি বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহের জন্য চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এছাড়া ৪০ থেকে ৫৫ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার দু’টি প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাঙ্কার জাহাজ অর্জন শীর্ষক প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির সভা গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এরপর অপর দু’টি জাহাজের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তিনি বলেন, সর্বশেষ অর্থ বছরে (২০২৪-২০২৫) এ ৮০০ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ৩০৬ কোটি টাকা নীট মুনাফা অর্জন করে বিএসসি। যা বিএসসি’র ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিএসসির এ সাফল্য এবং সফলভাবে জাহাজ অর্জনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর ও গতিশীল নেতৃত্ব প্রদানের জন্য নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ও আন্তরিক ভূমিকা রেখেছে।
কমডোর মাহমুদুল মালেক আরো বলেন, ধীরে ধীরে পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে আসতে শুরু করেছে বিএসসি। পর্যায়ক্রমে জাহাজের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে লাভজনক এ প্রতিষ্ঠান সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করে দেশে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখছে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন— মহাব্যবস্থাপক অর্থ মো: আজমগীর, নির্বাহী পরিচালক (বাণিজ্য) মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা, নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ক্যাপ্টেন মুজিবুর রহমান প্রমুখ। বাসস