৫ আগস্ট সকালে মা-বাবা তাকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করেছিলেন, আশঙ্কা করছিলেন বিপদের।

‘সেদিন আমরা তাকে বাসায় আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্য ওয়াশরুমে গেলে, সে মায়ের নিষেধ অমান্য করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।’ কথাগুলো বলছিলেন, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক উপপরিচালক সত্তরোর্ধ্ব সৈয়দ গাজিউর রহমান। একমাত্র সন্তান সৈয়দ মুনতাসির রহমানকে হারিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন তিনি।

গাজিউর বলেন, ওই দিন মা-ছেলের মধ্যে কথাকাটাকাটিও হয়েছিল। ‘মুনতাসিরের মা বলেছিল, যদি আজ আন্দোলনে যায়, তাহলে আর ঘরে ঢুকতে দেয়া হবে না।’

মুনতাসিরের উত্তর ছিল, ‘আজ আমি ফিরব না।’ তার কথা সত্য হলো- সে আর কোনোদিন ফিরেনি, ফিরবে না।’

বাবা গাজিউর বলেন, ‘আমরা সকালে তাকে আটকে রাখায় সে পরে যোগ দিয়েছিল মিছিলে, ফলে তার পরিচিত সঙ্গীদের পায়নি।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।

তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার একাদশ শ্রেণির ছাত্র সৈয়দ মুনতাসির রহমান ছিলেন গাজিউর রহমান (৭০) ও শিরিন সুলতানার (৫৫) একমাত্র সন্তান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর আসেননি।

সেদিন দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মুনতাসির। সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর সাথে তিনিও শাহবাগ অভিমুখী মিছিলে যোগ দিতে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করছিলেন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

অভ্যুত্থান সফল হয়, প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু যেই স্বপ্ন নিয়ে মুনতাসির লড়েছিলেন, তার বিজয় তিনি দেখে যেতে পারেননি। বিজয়ের মাত্র এক-দুই ঘণ্টা আগে, একটি গুলি তার মাথা ভেদ করে তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়। এই অকাল মৃত্যু তার মা-বাবার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, কারণ তাদের সান্ত্বনা দেয়ার মতো আর কেউ নেই।

‘আমি জানি না আল্লাহ আমাদের কীসের পরীক্ষা নিচ্ছেন। মুনতাসির ছিল আমাদের একমাত্র সন্তান। বহুদিন চাওয়ার পর আল্লাহ আমাদের তাকে দিয়েছিলেন,’ কান্না সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে শান্তভাবে বলছিলেন শোকাহত গাজিউর।

যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে এই প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে ছেলের স্মৃতি হাতড়ে ফিরছিলেন গাজিউর। তিনি বলেন, ‘মুনতাসির কেবল আন্দোলনে অংশ নেয়নি, বরং সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিল। আমার ছেলে সবসময় আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকত, জাতীয় পতাকার ছবি আঁকা টি-শার্ট গায়ে দিত, মাথায় পতাকা বাঁধত। জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মুনতাসির কখনো পিছপা হয়নি। পুলিশের দমন-পীড়নকে উপেক্ষা করেও সে নিজের আদর্শের পক্ষে অনড় ছিল।’

তিনি জানান, ‘তার ছেলে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল। প্রতিদিন জোহরের নামাজের আগে বাসায় ফিরে আসত। কিন্তু ওই দিন আসরের পরও ফিরে আসেনি। আমরা তখন কাজলা এলাকায় আহতদের সেবা করছিলাম। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর উল্লাসরত জনগণের দিকে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল পুলিশ। ভাবছিলাম, আমার ছেলে বিজয় উদযাপন শেষে ফিরে আসবে।’

কিন্তু আসরের পর দুশ্চিন্তা চেপে ধরল। তিনি ছেলেকে খুঁজতে বের হলেন। সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত হাসপাতাল খুঁজেও কোনো সন্ধান মেলেনি। শেষমেশ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গে এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় ছেলের লাশ খুঁজে পান তিনি।

‘অগণিত লাশের স্তূপের নিচে পড়ে ছিল আমার মুনতাসির।’ পোস্টমর্টেম ছাড়াই, মৃত্যুর সনদ ছাড়াই, পরিবারের কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয় কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ৬ আগস্ট।

‘আমার ছেলে লেখালেখিও করত, শিশুদের জন্য বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লিখত।’ তিনি জানান, মুনতাসির এ বছর দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। বাবার প্রস্তাব ছিল- গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার। কিন্তু সে রাজি হয়নি। বরং ইংরেজি ও কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হয়েছিল দক্ষতা বাড়ানোর জন্য।

‘তার স্বপ্ন ছিল আলিম (এইচএসসি) শেষে বুয়েটে ভর্তি হওয়া। কিন্তু স্বৈরশাসক হাসিনা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে।’ ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেছেন গাজিউর।

তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’ সূত্র : বাসস