বাংলাদেশের ১৭তম অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন হয়েছে। এখন আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন সম্পূর্ণ হচ্ছে না। অতীতের মতো সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশের গায়েবি ও মিথ্যা মামলার যে অভিযোগ ছিল, সেটাও এখন আর শোনা যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। গত এক বছরে কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে গুম হওয়ার ঘটনা হয়নি এবং রাতের আঁধারে তুলে নেওয়ার আতঙ্ক মানুষের মন থেকে দূর হয়েছে। তবে, হাতে গোনা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত লাল জুলাইয়ের কবিতা শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। এ সময় জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, অভ্যূত্থানে শহিদ ইয়ামিনের পিতা, আহত খোকন চন্দ্র বর্মন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহম্মেদসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।  

আসাদ্দুজামান বলেন, অন্তবর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগের সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। আজ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিচার বিভাগের সংস্কার চলছে। এর ফলে অসংখ্য দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। বিশেষ করে, অতীতে যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী লেখার নামে ফ্ল্যাট আত্মসাতের মতো আলোচিত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে। একই সাথে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং তথাকথিত ‘বেগমপাড়া’র লুটেরাদের সম্পদ উদ্ধারে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, আমরা নবজাগরণের প্রত্যয়ে সাম্য ও ন্যায়ের বাংলাদেশ গড়ছি। কবি হেলাল হাফিজের “এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়” এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের “এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান… আগামী শিশুর যোগ্য করে গড়ে তুলে যাব এ আমার অঙ্গীকার”—এই বাণীগুলো যুগে যুগে বিপ্লবী, ছাত্র ও সংগ্রামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়েছে। আমরা গণতন্ত্র, সাম্য, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য এ কাজ করছি।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রামের পাতায় আমরা '৯০-এর সংগ্রামকে বাদ দিয়ে আমাদের লড়াইয়ের কথা চিন্তা করি, তবে আমাদের মনে হবে জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা, কাঞ্চন, রাউফুন বসুনিয়ার রক্ত বৃথা গেছে; শহীদ নূর হোসেনের রক্ত বৃথা গেছে; মিলনের রক্ত বৃথা গেছে; জিহাদের রক্ত বৃথা গেছে। আমরা তা প্রত্যাশা করি না। বাংলাদেশের লড়ায় সংগ্রামে ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ইতিহাসের অন্যন্য অধ্যায়। সর্বশেষ ২৪ জুলাইয়ের বিপ্লব আমাদের অহংকারের অংশ। ২৪ জুলাইয়ের শহীদরা আমার ভাই, আমার বোন, আমার আত্মীয়, আমার স্নেহের ছোট বা বড় ভাই এবং আমার স্নেহের ছাত্রসমাজ রক্ত দিয়েছে। আমরা ২৪ জুলাইয়ের এই সংগ্রামকে হৃদয়ে ধারণ করি। কিন্তু এই সংগ্রামকে ধারণ করতে গিয়ে যদি আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত সংগ্রামের কথা ভুলে যাই, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো নতুন সংগ্রামের আগেই সেই বিস্মৃতি আমাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যারা এই কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করে বাংলাদেশকে বিভক্ত করতে চান, তারা দেশকে দুটি শিবিরে ভাগ করতে চান: একদিকে বাংলাদেশপন্থী, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি; অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট, খুনি, লুটেরা ও ধর্ষকদের শক্তি। আজ আমাদের পক্ষ বেছে নেয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশপন্থী নয়, গণতন্ত্রপন্থী নয়, জনগণপন্থী নয় এবং যারা খুনিকে সমর্থন করে, তারা আমাদের বন্ধু হতে পারে না।