মাস দুই আগে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষণা শেডে অজানা রোগে গবেষণার কোয়েল পাখি, মুরগি ও টার্কি মারা যাওয়ার খবর প্রকাশ পায় নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যদিও এসব প্রাণির মৃত্যুর কারণ হিসেবে কেউ কেউ বার্ড ফ্লু বা এভিয়েন ইনফ্লুয়েন্সা ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গবেষণার এসব প্রাণি মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটন হয়নি আজও। এবার অজানা রোগে পরপর ৭টি গবেষণার গরু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে চারটি। নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে তিনটি।

গবেষণার গরু ঠিক কোনো কারণে মৃত্যু হলো তা উদঘাটনে পোস্টমর্টেম করার কথা থাকলেও তা না করে অতিগোপনে তা সাভারস্থ বিএলআরআই চত্বরে পুঁতে ফেলার অভিযোগ উঠে।

গবেষণার কোয়েল, মুরগি, টার্কি ভাইরাসে আক্রান্তের তথ্য গোপনের মতোই গরু আক্রান্তের খবরও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে গোপন রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র বলছে, গত ২৬ জানুয়ারি পাবনা ক্যাটল জাতের (ট্যাগ নম্বর ৮১২) একটি গাভী মারা যায়। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি পাবনা ক্যাটল জাতের (ট্যাগ নং ১৪১৭) একটি বাছুর মারা যায়। এর সপ্তাহ না পেরুতেই ১৯ ফেব্রুয়ারি আরেকটি গরু (ট্যাগ নং ১৩৬৩) মারা যায়। একইদিনে পাবনা ক্যাটলের (ট্যাগ নং ১৩৯৫) একটি গরু স্পট নিলাম করা হয়।

পরবর্তীতে গত ১৮ মার্চ অসুস্থতাজনিত কারণে পাবনা ক্যাটলের (ট্যাগ নং ৯১৪) একটি গরু স্পট নিলাম করেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৫ এপ্রিল ঈদুল ফিতরের ছুটি চলাকালে সি এইচ বিফ ব্রিড (ট্যাগ নং ১৩১২) জাতের একটি গাভী মারা যায়। ঠিক কোন কারণে গাভীটি মারা গেছে, তার পোস্টমর্টেম ছাড়াই ফার্ম সুপারের মৌখিক নির্দেশে তার অনুপস্থিতিতে কয়েকজন ওয়ার্কার শেডের পাশের জঙ্গলে মাটি চাপা দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এর দুদিন পর গত ৭ এপ্রিল আরো একটি ষাড় গরু (বিসিবি ১৩৩৭ ট্যাগ) নিলামে বিক্রি করা হয় বলে জানা যায়।

গবেষণার এসব গরু কী কারণে মারা গেলো বা আক্রান্ত হলো তা উদঘাটনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি বিএলআরআই-এর সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, বিএলআরআই-এর বর্তমান মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্ব) ডা. শাকিলা ফারুক গত ১০ নভেম্বর দায়িত্ব নেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়ে একটা কোরাম তৈরি সবকিছু পরিচালনা করছেন। প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাদেক আহমেদ ও ড. মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ এবং ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আশাদুল আলম, মো. ইউসুফ আলী ও ড. মো. খায়রুল বাশার-এই ৫ কর্মকর্তা যা বলছেন তিনি তাই-ই করছেন। সংস্থাটিতে তারা পঞ্চপাণ্ডব হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।

বিগত সরকারের সময় প্রকল্প পরিচালক থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রেই বিশেষ সুবিধাভোগী ডিজি শাকিলাসহ এসব কর্মকর্তা। এখন তারাই আবার ৫ আগস্ট পরবর্তী বিএলআরআইতে বঞ্চনার সুর তুলছেন।

কোয়েল ও মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনায় দুইজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমে কথা বলার কারণে শোকজ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিএলআরআইতে এখন যেন স্বৈরশাসন চলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলেও কোনো কথা বলা যায় না। ডিজিসহ তাকে ঘিরে রাখা কর্মকর্তারা সবাইকে বিশেষ নজরে রাখছেন। এতে গবেষণা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, ডিজি শাকিলা ফারুক সহ মোট ১৮ জন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বা চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা রয়েছেন। তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা ২ জন। শাকিলা ফারুক চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মধ্যে গ্রেডেশনের প্রথমে থাকায় তাকে ডিজির সাময়িক দায়িত্ব দিয়েছে মন্ত্রণালয়। ডিজিরই ঘনিষ্ট এক কর্মকর্তা (বন্ধু) মিডিয়ায় কথা বলেছিলেন। তিনিও নাকি পরবর্তীতে ডিজি হওয়ার দৌড় দিচ্ছিলেন। তিনি শোকজ খেয়েছেন শুধু নয়, পঞ্চপান্ডবের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষণা শেডের কোয়েল, মুরগি ও টার্কি মারা যায়। বিভিন্ন পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, এটি বার্ড ফ্লু (এভিয়েন ইনফ্লুয়েন্সার)। তদন্ত বা পোস্ট মর্টেম না করেই মাটিতে পুঁতে দিয়ে বিষয়টি গোপনের চেষ্টা করে বিএলআরআই। যদিও পরবর্তীতে এটি আর আড়াল থাকেনি, দৈনিক নয়া দিগন্তে খবর প্রকাশের পর চাউড় হয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে।

গবেষণার কোয়েল পাখির শেড থেকে এই অজানা রোগ পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে গবেষণার মুরগি ও টার্কি শেডেও। বিপুল সংখ্যক গবেষণার কোয়েল,মুরগি ও টার্কি অজানা রোগে মারা গেলেও বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হয়। এ নিয়ে খবর প্রকাশ হলেও এসব পাখির মৃত্যুর সঠিক কারণ অজানাই রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ডা. শাকিলা ফারুককে মঙ্গলবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবের কাছে তার রুমে গিয়ে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. এস এম জোবায়দুল কবিরও বলেন, অনুমতি ছাড়া আমাদের মিডিয়ায় কথা বলা নিষেধ আছে।

এ বিষয়ে উপদেষ্টা ফরিদা আখতারকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফোন দিলেও রিসিভ করেননি।