দেশের পরমাণু বিজ্ঞান ও গবেষণার উন্নয়নে কমিশনের স্বায়ত্বশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং একটি পেশাদার ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ সুনিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিজ্ঞানী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের পরমানু শক্তি কমিশনের অডিটরিয়ামে আয়োজত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। দাবি পুরণ না হলে কর্মবিরতী দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি ড. এ এস এম সাইফুল্লাহ। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. মো: গোলাম রসুল, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক) অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরেফিন, সাধারণ সম্পাদক এ টি এম গোলাম কিবরিয়া, বাপশক কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ইসমাইল হোসেন মামু, মহাসচিব মো: কামরুজ্জামান উজ্জ্বল প্রমুখ।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার রীতিনীতি অনুসরণক্রমে বাংলাদেশে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, উন্নয়ন, প্রসার, তদ্সংশ্লিষ্ট গবেষণা কর্ম, সেবা, শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র-সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক) ১৯৭৩ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার নম্বর ১৫ তথা ২০১৭ সালের ২৩ নম্বর আইন বলে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশেষায়িত কমিশন। কমিশনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় আট লক্ষাধিক ব্যক্তি ও শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করে থাকে।’

‘মালিক সংস্থা হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন-সংক্রান্তু সকল চুক্তি এবং লাইসেন্সসমূহ কমিশনের হওয়া সত্ত্বেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কমিশনকে বাদ দিয়ে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি পিডিবি ও এনপিসিবিএলের মধ্যে সম্পাদনের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। মালিক সংস্থা হওয়া সত্বেও কমিশনকে বাদ দিয়ে নবগঠিত একটি কোম্পানির সাথে এ ধরনের চুক্তি করার প্রচেষ্টা কমিশনের অধিকার খর্ব করা এবং কমিশনকে দূর্বল করার অপচেষ্টারই অংশ।’

‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার রীতিনীতি মেনে পরমাণু প্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিশেষায়িত গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে বিগত সরকারের চাপিয়ে দেয়া iBAS++ সিস্টেমে সংবেদনশীল কাজ করা সম্ভব কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাছাড়াও পারমাণবিক বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট গবেষণা এবং এ সংক্রান্ত প্রকল্প ও তার পরিচালন ব্যয়সহ সকল তথ্য সংবেদনশীল হওয়ায় iBAS++ সিস্টেমের মতো একটি সার্বজনীন সিস্টেমে উক্ত তথ্য আপলোড করা সমীচীন নয় বলে কমিশনের বিজ্ঞানীরা মনে করে।

এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জানতে পেরেছি একটি ভারতীয় একটি সফটওয়ার। যেটির সার্ভার চেন্নাই থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সুতরায় এই সিস্টেমে অন্তর্ভূক্ত করতে বাধ্য করার প্রচেষ্টা কমিশনের মতো একটি বিশেষায়িত সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব নষ্ট করার অপচেষ্টা বলে মনে হয়।’

‘এই সিস্টেমে প্রবেশ না করায় কমিশনের অনুকূলে অর্থ ছাড় বন্ধ করা হয়েছে। ফলে কমিশনের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন প্রাপ্তিসহ গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কমিশনে কর্মরত প্রায় ৬০০ বিজ্ঞানীসহ ২৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মার্চ ২০২৫-এর বেতন-ভাতাদি এখনো পাননি। এই প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্বশাসন, ন্যায্য অধিকার ও সম্মান রক্ষা না হলে দেশের পরমাণু বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

‘কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ পদগুলো শূন্য থাকায় কমিশনের সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বর্তমানে চেয়ারম্যান পদে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং মাত্র একজন সদস্য চলতি দায়িত্বে নিয়োজিত। পূর্ণ কমিশন না থাকায় এবং মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং কর্তৃত্ববাদী আচরণের কারণে কমিশনের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা বাপশক আইন ২০১৭ এবং বাপশক চাকরি বিধিমালা ১৯৮৫-তে প্রদত্ত সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

‘২০১১ সালে তৎকালীন সরকার কমিশনের জিও প্রদানের ক্ষমতা রহিত করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপর ন্যস্ত করে। তখন থেকে কমিশনের বিজ্ঞানীগণ উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফ্যাসিস্ট সরকার বিতাড়িত হলেও এখনো মন্ত্রণালয়ে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসর আমলারা অন্যায়ভাবে পূর্ণ স্কলারশিপ থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা/প্রশিক্ষনের জিও প্রদান না করে এবং অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করে কমিশনের নবীন বিজ্ঞানীদের বঞ্চিত করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্য বিজ্ঞানীদের বাদ দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নিজেরাই শুধুমাত্র বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশে বিদেশের বিভিন্ন বিশেয়ায়িত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছেন। গত কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১২ জন কর্মকর্তা পরমাণু প্রযুক্তিবিষয়ক বৈদেশিক প্রশিক্ষণে মনোনয়ন নিয়েছেন, যা হতাশাজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। বিজ্ঞানীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ উৎসাহিত না করে বাধাগ্রস্ত করার বিষয়টি দেশকে পরমাণু গবেষণায় পিছিয়ে রাখার কোনো এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে হয়।’